বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতি
নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বন্ধের দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। আজ শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, এগুলো কোনো চেতনা থেকে নয়, বরং যা কিছু বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, সেগুলোকে মুছে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীলনকশা চলমান রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, রাষ্ট্র ও জনগণের টাকা খরচ করে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নামকরণের সংস্কৃতি স্পষ্টতই বন্ধ হওয়া উচিত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কারও নামে স্থাপিত স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতিতেও রেশ টানা প্রয়োজন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নয়া বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেওয়া জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে। এমন অনেক স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বা করতে উদ্যত হয়েছে, যা অপ্রয়োজনীয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি খড়্গ পড়েছে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলোর ওপর। কিন্তু পাশাপাশি দেখা গেছে, যা কিছু ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’–এর নামে স্থাপিত, সেগুলোতেও হাত দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর আগের নাম বাতিল করে কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন না করেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ঘটনার নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, এমন অভিযোগ শিক্ষক নেটওয়ার্কের। বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেছে, এই প্রবণতারই সর্বশেষ নজির গড়া হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কারিগর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তারা এই পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করছে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার দাবি জানাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নতুন দুই ছাত্রাবাস নির্মিত হয়, তখন জাতীয় দুই নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়। ছাত্রাবাস দুটি পাশাপাশি অবস্থিত। এরপর বহু সরকার এসেছে ও গিয়েছে, কখনোই এই দুই ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তনের কথা ওঠেনি। কিন্তু এখন বঙ্গবন্ধু হলের নাম পরিবর্তন হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ব উদ্দেশ্যের বহিঃপ্রকাশ।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোলে অনেক ভাঙচুর ও পরিবর্তন হচ্ছে, যার অনেক কিছুই ন্যায্য নয়। জাতীয় নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে বাংলাদেশের প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি পাশাপাশি ছাত্রাবাস থাকার যে সহাবস্থানগত সৌন্দর্য, তা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিকে স্পন্দিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বলে শেখ মুজিবুরের নাম মুছে ফেলতে হবে। বরং তাঁর নামে একটি ছাত্রাবাস থাকা কেবল ন্যায্যই নয়, প্রয়োজনীয়ও বটে।
শহীদ হাদির নামে নতুন কোনো ভবনের নামকরণ করার প্রস্তাব করে বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক আরও বলেছে, ‘তিন-চার দশক ধরে জাতীয় নেতার নামে যে ছাত্রাবাস একনামে পরিচিত, তা বদলে দেওয়ার উদ্যোগকে আমরা সন্দেহ করি ও মনে করি, হীন রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতা থেকে উদ্ভূত।’ অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষকেরা।