প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী এখনো ডিজিটাল সেবার বাইরে
আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও ডিজিটাল সেবা নকশার ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা খুব কমই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং সেবা, সরকারি ওয়েবসাইট, টেলিযোগাযোগ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র পুরোপুরি ডিজিটাল হলেও পরিকল্পনার সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতা যথাযথভাবে দেখা হয়নি। ফলে আজও এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ডিজিটাল সেবার বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সেবা কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এটি সরাসরি ব্যক্তির অধিকার, অংশগ্রহণ এবং মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা মনে করেন, এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন–অনুযায়ী, দেশে মোট ১২ ধরনের প্রতিবন্ধকতা স্বীকৃত। এর মধ্যে রয়েছে অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, বাক্প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ-দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপের তথ্য বলছে, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৪৬ লাখ। তবে সামাজিক লজ্জা, সচেতনতার অভাব এবং জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবে সংখ্যাটি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
‘অদৃশ্য’ সরকারি ওয়েবসাইট
সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের এসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) তথ্য বলছে, বর্তমানে সরকারি দপ্তর ও মাঠপর্যায়ে ৩৩ হাজারের বেশি সরকারি ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা রয়েছে। এ ছাড়া জব পোর্টাল, ই-কমার্স, নিউজ পোর্টাল এবং অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবাও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য অধিকাংশ সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব ওয়েবসাইটে স্ক্রিন রিডার ঠিকভাবে কাজ করে না, কি–বোর্ড ব্যবহার করে সহজে নেভিগেশন করা যায় না। অনেক বেসরকারি ওয়েবসাইট ও নথিও এমনভাবে প্রকাশ করা হয়, যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহার করা কঠিন।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হাসান বলেন, ‘সরকারি ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করতে পারি না। সেবা নিতে গেলে ফরম পূরণ করতে হয়, সেগুলোতে ক্যাপচা কোড থাকে। বিকল্প না থাকায় অন্যের সাহায্য ছাড়া ওই সেবাগুলো নিতে পারি না।’
ব্যাংকিং সেবায় বাধা
ব্যাংকিং খাতেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করা সহজ নয়। এটিএম বুথে সহায়ক প্রযুক্তি না থাকায় স্বতন্ত্রভাবে লেনদেন করাও কঠিন। আবার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপগুলোতে প্রয়োজনীয় অ্যাকসেসিবিলিটি সুবিধা না থাকায় অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এসব সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার টাকার ক্ষেত্রেও কোনটি কত টাকার নোট, সেটিও ধরে বোঝার উপায় নেই দৃষ্টিবন্ধীদের জন্য।
প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন নাজমা আরা বেগম। তিনি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেশির ভাগ ব্যাংকের ওয়েবসাইটগুলো অ্যাকসেসেবল না। এটিএম বুথগুলোতেও একই অবস্থা। একজন ব্যক্তির সবচেয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হলো তাঁর আর্থিক লেনদেন। অথচ আমাদের সেটি অন্যের সাহায্য নিয়ে করতে হয়।’
টেলিযোগাযোগ সেবায়ও বিকল্প সীমিত
টেলিযোগাযোগ সেবায় গ্রাহক শনাক্তকরণের অন্যতম প্রধান উপায় হলো হাতের আঙুলের ছাপ। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধী অনেক মানুষের পক্ষে আঙুলের ছাপ দেওয়া সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো সহজ বা বিকল্প ব্যবস্থা নেই।
উন্নয়নকর্মী সুমনা আক্তারের শারীরিক সমস্যার কারণে হাতের আঙুলের ছাপ স্পষ্ট আসে না। মুঠোফোনের সিম নিতে গিয়ে তাঁকে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ করার পর তাঁর সিম নিবন্ধন হয়।
বাংলাদেশ ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব পারসনস উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি (ইউএনসিআরপিডি) স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর করেছে। জাতিসংঘের এ কনভেনশনে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট সব সেবা অন্যান্য নাগরিকের মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম–অধিকারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
এসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট (অ্যাকসেসিবিলিটি) ভাস্কর ভট্টাচার্য নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এ বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইটগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে।