তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় দ্বিতীয় পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ‘সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরি’র প্রতিষ্ঠাতা, ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা লোরা খান। আলোচনার বিষয় ছিল ‘সিক্স ইয়ার্ডস, ইনফিনিট স্টোরিজ: নকশা, পরিচয় ও নবায়নে লোরা খান’।
‘আমি সব পারব, এমন ভাবার দরকার নেই। যেটা পারবেন না, সেটার জন্য এক্সপার্টদের সাহায্য নিতে হবে।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন লোরা খান। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোয়।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, ‘সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরির প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ ডিজাইনার হিসেবে আপনার শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? কবে এবং কেন যাত্রা শুরু করলেন?’
লোরা খান বলেন, ‘সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরির যাত্রা শুরু ২০১২ সালে। তখন আমি আর্কিটেকচার বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। ডিপার্টমেন্টের কাজের প্রয়োজনে আমাদের অনেক জায়গায় যেতে হতো। একবার আমার এক কাজিনের বিয়েতে ১৫-১৬ জন বন্ধুকে সিরাজগঞ্জে আমার গ্রামে নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, তাঁরা তাঁতঘরের শব্দ আর তাঁতিদের কাজ দেখে বেশ অভিভূত। এমনকি আমার বন্ধুরা সেখান থেকে কম দামে সরাসরি তাঁতিদের থেকে শাড়িও কেনে। পরে ঢাকায় ফিরে তাদের শাড়িগুলো দেখে অন্যরাও বেশ আগ্রহ দেখাতে থাকে। এভাবেই মাঝেমধ্যে তাঁদের শাড়ি এনে দিতে গিয়েই মূলত এই ব্যবসার চিন্তা আমার মাথায় আসে।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ব্যবসার শুরুতে মূলধনের ব্যবস্থা কীভাবে হয়েছিল?
উত্তরে লোরা খান বলেন, ‘শুরুতে আমার তেমন কোনো বাজেট ছিল না। আম্মু আমাকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে বলেন, এই টাকা যেন আমি ফেরত দিই। ওটাই ছিল আমার ব্যবসার “সিড মানি”। মায়ের দেওয়া সেই টাকা দিয়েই ফেসবুক পেজ খোলার মাধ্যমে শুরু হয় সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরির যাত্রা।’
ব্র্যান্ডের নাম ‘সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরি’ রাখার কারণ কী? জানতে চাইলে লোরা খান বলেন, ‘যেহেতু শাড়ি মূলত ছয় গজের হয়, তাই সেই ধারণা থেকেই মাথায় আসে ছয় গজের গল্প। সেখান থেকেই নাম দিই সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরি।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘আপনি তো শাড়ি দিয়ে শুরু করেছিলেন, গয়নার দিকে ঝুঁকলেন কীভাবে?’
লোরা খান বলেন, ‘শুরুতে যখন আমি পেজের জন্য বন্ধুদের শাড়ি পরিয়ে ছবি তুলতাম, তখন আমার নিজের সংগ্রহ থেকেই কিছু গয়না তাঁদের পরতে বলতাম। তখন দেখলাম, মানুষ শাড়ির চেয়ে আমার গয়নার দাম বেশি জিজ্ঞেস করছে। আর আমি শুরু থেকেই গয়নার ব্যাপারে বেশ খুঁতখুঁতে ছিলাম। এমনকি চাবির রিং খুলে লকেট বানিয়েও পরতাম। তখন বুঝলাম, শাড়িতে শুরুতে ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করার সুযোগ কম থাকলেও গয়নায় আমার সৃজনশীলতা দেখানোর জায়গা অনেক বেশি। এই ভাবনা থেকেই গয়না ডিজাইন শুরু করি।’
ব্যবসার শুরুর দিকে বিশ্বাসযোগ্যতা ও ডেলিভারির চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে লোরা খান বলেন, ‘তখন ফেসবুক মার্কেটপ্লেস আজকের মতো এত জনপ্রিয় ছিল না। মানুষের মনে ফ্রডের (প্রতারণার) ভয় ছিল অনেক। কিন্তু আমার গ্রাহকদের সঙ্গে একটা ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর ডেলিভারির কথা বলতে গেলে বেশ চ্যালেঞ্জ পোহাতে হয় সে সময়। এমনও দিন গেছে, আমি নিজে গিয়ে কাস্টমারের বাসার নিচে দাঁড়িয়ে গয়না ডেলিভারি দিয়ে এসেছি। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে আজ খুব অদ্ভুত লাগে।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘কোভিড মহামারি চলাকালীন আপনি ওষুধ ডেলিভারি করেছিলেন। এটি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ছিল নাকি মানবিক দিক বিবেচনায়?’
জবাবে লোরা খান বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ মানবিক দিক থেকে একটা উদ্যোগ ছিল। কোভিডের সেই কঠিন সময়ে আমি আমার রিসোর্সগুলো কাজে লাগিয়ে ওষুধ ডেলিভারির কাজ করেছি। এতে আমার ব্যবসায়িক কোনো ভ্যালু অ্যাড হয়েছে কি না জানি না, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমি আমার নিজের কাছে স্বচ্ছ থাকতে চেয়েছি। ওই সময় আমার যেটুকু সামর্থ্য ছিল, তা দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল মূল লক্ষ্য।’
‘মিস ইউনিভার্সের প্ল্যাটফর্মে সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরির গয়না যখন ব্যাপক ভাইরাল হলো, অনুভূতি কেমন ছিল?’ জানতে চাইলে লোরা খান বলেন, ‘তখন আমি আসলে ওটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি সব সময় যেমন মন দিয়ে কাজ করি, সেটাও তেমনই ছিল।’
লোরা খান আরও বলেন, ‘কিন্তু বড় ব্যাপার হলো, একটা গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে জামদানি শাড়ির সঙ্গে আমার গয়না প্রতিনিধিত্ব করেছে। এটা আমাদের দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য অনেক বড় একটা সুযোগ। আমি মনে করি, মিডিয়া বা সিনেমার মাধ্যমেও আমাদের কাজগুলো এভাবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা সম্ভব।’
সৃজনশীলতা আর ব্যবসা কি একসঙ্গে চলে? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে লোরা খান বলেন, ‘আপনি যা-ই করুন না কেন, দিন শেষে সেটা একটা বিজনেস। যদি বলেন, আপনি শুধু সৃজনশীল কাজ করবেন কিন্তু সেটা কীভাবে কাস্টমারের কাছে যাবে বা বিক্রি হবে তা বুঝবেন না, তবে সেই সৃজনশীলতা একসময় হারিয়ে যাবে। কাজের কোনো ফল না এলে যে কেউ হতাশ হয়ে যায়। তাই নিজে না জানলে বিশষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে, কিন্তু ব্যবসার প্রক্রিয়াটা বুঝতে হবে।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে লোরা খান বলেন, ‘এখনকার সময়টা অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। তাই কেউ যদি নতুন কিছু শুরু করতে চান, তবে তাঁকে অনেক বেশি পরিশ্রমী হতে হবে। ব্যবসায় লোকসান হবে, খারাপ সময় আসবে, হয়তো রাতে কাঁদবেনও, কিন্তু পরদিন সকালে সব ভুলে আবার নতুন করে কাজে নামার সাহস থাকতে হবে। কাজ চালিয়ে গেলে সফলতা আসবেই।’