মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন স্থপতি রবিউল হুসাইন
স্থপতি রবিউল হুসাইন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম কেবল স্থাপত্য বা কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় রবিউল হুসাইন ছিলেন নেপথ্যের মানুষ, যিনি বড় কাজ করেছেন নীরবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইনের জন্মদিন উপলক্ষে যৌথ আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ কথা বলেন জাদুঘরটির ট্রাস্টি মফিদুল হক। আজ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এ আলোচনা হয়।
এ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ (আইএবি)।
এর আগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অডিটোরিয়াম লবিতে ‘রবিউল হুসাইন জীবন ও শিল্পচর্চা’ শীর্ষক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন আইএবির সাবেক সভাপতি স্থপতি কাজী গোলাম নাসির।
মফিদুল হক বলেন, ১৯৯৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট গঠনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়। শুরু থেকেই উপলব্ধি ছিল, সমাজের সহযোগিতা ছাড়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচার একটি ভাড়াবাড়িতে যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ওই ভবনকে জাদুঘর হিসেবে উপযোগী করে তুলতে সংস্কারকাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন রবিউল হুসাইন।
আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বর্তমান স্থাপনার জমি নির্বাচন, পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে রবিউল হুসাইনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন মফিদুল হক। তিনি বলেন, পুরো নির্মাণপ্রক্রিয়ায় রবিউল হুসাইন ও স্থপতি সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও আইএবির মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করেছিলেন রবিউল হুসাইন। তাঁর এই অবদান ভবিষ্যতে দলিল আকারে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
আলোচনায় রবিউল হুসাইনকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেন তাঁর সহকর্মী স্থপতি ফারহানা শারমিন। তিনি বলেন, রবিউল হুসাইনের কাজ কেবল ব্যক্তিগত সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এতে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, উপকরণ ও পরিচয়ের প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর সাহিত্য ও স্থাপত্যকর্ম নিয়মিত পাঠ ও আলোচনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই হবে রবিউল হুসাইনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
ফারহানা শারমিন বলেন, রবিউল হুসাইন ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। তিনি কখনোই নিজেকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাইতেন না। তাঁর মধ্যে আত্মপ্রচারবিমুখ ও নীরব সাধনার প্রবণতা ছিল। এই মানসিকতা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভবন নির্মাণে রবিউল হুসাইনের অবদান স্মরণ করেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা নিজে করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা করেননি, কারণ তিনি চেয়েছিলেন এটি হোক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্মগুলোর একটি।
আলোচনার শুরুতে কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইনকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করে বক্তব্য দেন তাঁর সহকর্মী স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম। দীর্ঘদিন একসঙ্গে একটি প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কাজের চাপ ও জটিলতার মধ্যেও রবিউল হুসাইন সহকর্মীদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন।
স্মরণসভায় রবিউল হুসাইনের জীবন ও কর্ম নিয়ে মূল্যায়ন তুলে ধরেন তাঁর সহকর্মী স্থপতি কাজী এম আরিফ। তিনি বলেন, স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন ছিলেন একজন সৎ, দেশপ্রেমিক ও অন্তর্মুখী মানুষ।
স্থাপত্যচর্চায় রবিউল হুসাইনের দর্শন তুলে ধরে কাজী এম আরিফ বলেন, তিনি ইট ও কাঠের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। দেশের জলবায়ু, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপত্য নির্মাণে তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে রবিউল হুসাইন শুধু স্থপতি বা কবি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক শিল্পী লাইসা আহমদ লিসা। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে রবিউল হুসাইনের আবৃত্তি ও তাঁর জীবনী নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রকৌশলী খোরশেদ বাহার ও স্থপতি কাজী গোলাম নাসির।
১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারিতে ঝিনাইদহের শৈলকুপার রতিডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রবিউল হুসাইন। ভাষা ও সাহিত্যে অবদান রাখায় ২০১৮ সালে একুশে পদক পান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই ট্রাস্টি। তিনি একাধারে স্থপতি, কবি, শিল্প-সমালোচক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী। পেশা স্থাপত্যশিল্প হলেও সম্পৃক্ততা ছিল বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষকও ছিলেন তিনি।