বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নারী প্রতিনিধিত্বহীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও নারী আসন নিয়ে একক কোনো প্রস্তাব হাজির করতে পারেনি। একের পর এক প্রস্তাব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঐকমত্য কমিশন জাতীয় সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিষয়ে ‘নাটক’ করেছে।
আজ বুধবার ৭১টি সংগঠন নিয়ে গঠিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। তাঁরা আরও বলেন, গত এক বছরে বেড়েছে নারী বিদ্বেষও। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ন্যক্কারজনক সমাবেশ করা হলো। এ অবস্থায় নারী বিদ্বেষী প্রার্থী ও দলকে যেন কেউ ভোট না দেন, তাদের সঙ্গে কেউ যাতে জোট না বাঁধে, তা নিয়ে প্রচার চালানো দরকার।
আজ ৩ সেপ্টেম্বর আর্ন্তজাতিক সিডও দিবস উপলক্ষে ‘সংসদে নারীর কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রতিনিধিত্ব: সংরক্ষিত নারী আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরাসরি নির্বাচন’ শিরোনামে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয় রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে।
আলোচনায় বক্তারা জাতিসংঘের ‘নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ’ বা সিডও সনদের দুটি ধারা ২ ও ১৬ (গ)–এর ওপর বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণ প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাঁরা সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন চান।
সভা সঞ্চালনা করেন সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, এখন নতুন সংকট দেখা দিয়েছে—নারী বিদ্বেষী মনোভাব। এসব বিদ্বেষ সামনে আনা হচ্ছে নারীকে ভয় দেখিয়ে পশ্চাৎমুখী করে রাখার জন্য। তিনি আরও বলেন, সিডওর ওই দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার না হওয়ায় নারীর পারিবারিক, বিবাহসংক্রান্ত ও ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।
সভায় ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বেসরকারি সংগঠন ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির। ধারণাপত্রে বলা হয়, একটি গণতান্ত্রিক, সমতাপূর্ণ সমাজকাঠামো তৈরি করতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর সম–অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়ে ধারণাপত্রে বলা হয়, সংসদে মোট আসন ৪৫০ করা এবং এর মধ্যে ১৫০ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। দুটি সাধারণ আসন নিয়ে একটি সংরক্ষিত আসন করতে হবে। সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রথা বাতিল করে সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোট হতে হবে। এ ব্যবস্থা সংসদের দুই-তিন মেয়াদের জন্য বলবৎ থাকবে।
নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি
আলোচনায় অংশ নিয়ে কয়েকজন বক্তা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, কমিশন জানিয়েছে, জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০০ আসনে উন্নীত করার জন্য জন্য বিধান করা হবে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংরক্ষিত আসন ৫০টি বহাল রেখে সংবিধানের ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনের জন্য রাজনৈতিক দলকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত নারী প্রার্থী মনোয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে। ২৬টি দল ও জোট এতে একমত। নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দিয়েছে আমজনতার দল, সিপিবি ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)।
এ বিষয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা ওই প্রস্তাব মানিনি। আমরা বলেছি, এ ধরনের আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা সংরক্ষিত আসনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচন চাই। একের পর এক প্রস্তাব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতীয় সংসদে নারী আসন সংরক্ষণ বিষয়ে নাটক করেছে। অনেক প্রস্তাবে স্থির থাকলেও সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচনে অনড় থাকেনি। সর্বশেষ যা প্রস্তাব করেছে, সেটি মানার মধ্য দিয়ে সংরক্ষিত আসনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচনকে এক অর্থে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।’
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, নারীরা যদি বলতেন, এসব দাবি না মানা পর্যন্ত তাঁরা ভোট দেবেন না, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো দাবি মানতে বাধ্য হতো। নারীদের এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দাবি বাস্তবায়নে অনেক দল একমত হবে না। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর সংগ্রহ করে স্মারকলিপি জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ঐকমত্য কমিশনে নারীদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়াই। গত এক বছরে নারী বিদ্বেষ বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এক নারীকে প্রকাশ্যে গণধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। নারীদের অবমাননা করছেন, এমন দল ও প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। নারী বিদ্বেষী কোনো প্রার্থী ও দলের সঙ্গে ভোট ও জোট না করারও আহ্বান জানান তিনি। সাইফুল হক বলেন, এটাকে সামাজিক দাবি হিসেবে প্রচার করতে হবে।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশন নারী আসন নিয়ে একক কোনো প্রস্তাব দলগুলোর সামনে হাজির করতে পারেনি। আমরা সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন চেয়েছি। বিদ্যমান পদ্ধতিতে স্ত্রী, কন্যা, শ্যালিকারা সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পায়। সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচন না হওয়ায় জনগণের প্রতি তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা তৈরি হয় না।’
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ২০২৫ সালে এসেও নারীকে ভাবতে হয় তিনি মনোনয়ন পাবেন কি না, যা খুবই দুঃখজনক। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রচলিত রাজনৈতিক পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার।
ঐক্য ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম এ সবুর সব রাজনৈতিক দলকে নারীর জন্য আসনসংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য মাহীন সুলতান বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পর নারীর জন্য ৫ শতাংশ মনোনয়ন ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হওয়া অসম্ভব। সংসদে এখন ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। ১৫ সেপ্টেম্বর ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আশা করি, তারা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর কার্যকর ও ফলপ্রসূ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চলবে।
এ ছাড়া গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের প্রতিনিধি দিলীপ সরকার, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সাবেক কর্মকর্তা নাজরানা হক হীরা, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক লিপিকা তাপসী, দলিত নারীগোষ্ঠীর প্রতিনিধি তামান্না সিং বড়াইক, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শ্বাশতী বিপ্লব প্রমুখ।