ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে। ওই বছরের জানুয়ারিতে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পশুর নদ খননের একটি প্রকল্প পাস করে সরকার। প্রকল্পের আওতায় নদটি থেকে ২১৬ লাখ ঘনমিটার মাটি ও বালু তোলা হবে, যাতে নদীর নাব্যতা ও বন্দরে কর্মক্ষমতা বাড়ে। এতে কারও আপত্তি নেই।

কিন্তু নদ থেকে তোলা বালু বাণীশান্তার ৩০০ একর কৃষিজমিতে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি ওঠে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা জেলা প্রশাসকের পক্ষে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ওই ৩০০ একর জমি হুকুমদখলের নোটিশ দেন। পাশাপাশি ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চাষিদের জমির দখল ছেড়ে দিতে বলা হয়।

আমার রুহু থাকতে তো দেব (জমি) না, জীবন থাকুক আর যাউক।
স্থানীয় কৃষক সেলিম হাওলাদার

হুকুমদখলের জন্য বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত ২৮ জুলাই জমিতে সাইনবোর্ড বসাতে গেলে এলাকাবাসীর প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হয়। পরে ৯ আগস্ট খননযন্ত্র তোলার চেষ্টা করেও পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যেই চাষি ও গ্রামবাসীর সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন পরিবেশবাদীরা। তাঁরা বালু ফেলার জন্য চারটি অকৃষি জায়গার প্রস্তাব দেন বন্দর কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ ওই কৃষিজমিতেই বালু ফেলতে চাইছে।

গত মঙ্গলবার বিকেলে বাণীশান্তায় গিয়ে দেখা যায়, বন্দর কর্তৃপক্ষের এই তৎপরতার প্রতিবাদে বাণীশান্তা বাজারে কৃষক সমাবেশ করছেন স্থানীয় নারী-পুরুষ ও তরুণ-যুবারা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবাদীরা।

যে জমিতে বালু ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটি সমাবেশস্থল থেকে একটু দূরে। গ্রামের ইট বিছানো রাস্তায় ব্যাটারিচালিত ভ্যানে ওই জমিতে যেতে ১০-১২ মিনিট সময় লাগে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরো ৩০০ একর জমিতেই এখন আমন চাষ করা হয়েছে। এ সময় খেতের পাশের রাস্তাটি ধরে যাচ্ছিলেন রনি গোপাল মণ্ডল। এখানে সাড়ে ৪ বিঘা জমি আছে তাঁর।

সব জমিতে আমনের চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় অন্তত ১৬ মণ ধান পান। বালু ফেললে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, আমরা তো মারা পড়ে যাব। ঘরের ওপরে বালু উঠে যাবে। তখন আমরা কীভাবে ফলন (চাষ) করব।’ এখন এই জমিতে আমনের পাশাপাশি তরমুজ, রবিশস্য ও আউশ চাষ হয় বলে তিনিসহ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানালেন।

যে বালু কৃষিজমিতে ফেলা হবে, সেটি আমরা সরকারের দুটি সংস্থার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছি। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বালু ফেলার পর ওই জমিতে ফসল হবে না। তা ছাড়া পাশের চিলা এলাকাতেও পশুর নদের বালু ফেলা হয়েছে। সেখানে আজ পর্যন্ত কোনো ফসল ফলেনি
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

রনি গোপালের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন রহিম ঢালী। তিনি বলেন, ‘আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব। ভিক্ষা করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।’

তবে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা প্রথম আলোকে বলেন, ওই জমিতে মাত্র একটি ফসলই ফলে। কিন্তু সেটিকে এখন তিন ফসলি জমি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারি উন্নয়নপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

ওই জমিতে কতটি ফসল হয় জানতে কথা হয় অন্তত ২০ জনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, লবণাক্ততার কারণে এই জমিতে একসময় একটি ফসলই হতো। পরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ওই এলাকায় একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে লবণাক্ততা কমে যায় ও এক ফসলি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর হয়। এখন ওই এলাকার তরমুজ সারা দেশে পরিচিত।

বালু ফেললে ওই জমির উর্বরতা আরও বাড়বে দাবি করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘পশুর নদের পলিমাটি পড়বে ওই জমিতে। এতে জমির উর্বরতা বাড়বে। ওই জমি তো আমরা একেবারে নিচ্ছি না। তিন বছরের জন্য নেওয়া হচ্ছে। সেই তিন বছরের ক্ষতিপূরণ কৃষকদের দেওয়া হবে। তিন বছরের মধ্যে সেখানে আবার ফসল ফলবে।’

তবে এই দাবির সঙ্গে একমত নন কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘যে বালু কৃষিজমিতে ফেলা হবে, সেটি আমরা সরকারের দুটি সংস্থার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছি। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বালু ফেলার পর ওই জমিতে ফসল হবে না। তা ছাড়া পাশের চিলা এলাকাতেও পশুর নদের বালু ফেলা হয়েছে। সেখানে আজ পর্যন্ত কোনো ফসল ফলেনি।’

বাণীশান্তা জমি রক্ষা কমিটির সভাপতি সত্যজিৎ গায়েন বলেন, ‘নদীর খনন বন্ধ হোক আমরা সেটি চাই না, আমরা চাই তিন ফসলের জমি যেন নষ্ট না করা হয়, বিকল্প জায়গায় যেন বালু ফেলা হয়। ওই জমিতে বালু ফেলা হলে এক হাজার দুই শর মতো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

গতকাল বুধবার কৃষিজমি রক্ষার জন্য সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ একটি প্রতিনিধিদল খুলনা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সম্পর্কে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জেলা প্রশাসক আমাদের বলেছেন, কৃষিজমি রক্ষাসংক্রান্ত এলাকাবাসীর একটি আবেদন তিনি পেয়েছেন। আবেদনটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।’

ফসল না ফলাতে পারলে কীভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন স্থানীয় কৃষক সেলিম হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আমার রুহু থাকতে তো দেব (জমি) না, জীবন থাকুক আর যাউক।’ তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ চান না উল্লেখ করে বলেন, অন্য কোনো জায়গায় ড্রেজিংয়ের বালু ফেলা হোক, কৃষিজমিতে নয়।

ফসল না ফলাতে পারলে কীভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন স্থানীয় কৃষক সেলিম হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আমার রুহু থাকতে তো দেব (জমি) না, জীবন থাকুক আর যাউক।’ তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ চান না উল্লেখ করে বলেন, অন্য কোনো জায়গায় ড্রেজিংয়ের বালু ফেলা হোক, কৃষিজমিতে নয়।