গর্ব করে বলি আমি এম এ পাস চাওয়ালা
করোনাকালে চাকরি হারিয়ে চা বিক্রির পেশা বেছে নিয়েছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মো. সহিদুল ইসলাম। রাজধানীর ভাটারা থানার কাছে একটি চায়ের দোকান দিয়েছেন, যার নাম ‘এমএ পাস চাওয়ালা’। তাঁর চা বিক্রির খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সহিদুলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানসুরা হোসাইন।
প্রশ্ন :
দোকান কেমন চলছে?
সহিদুল: বেশ ভালো। গত ১ অক্টোবর দোকান চালু করি। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার চা বিক্রি করেছি। ক্রেতা আকর্ষণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর, বিশেষ করে ১৩ নভেম্বর প্রথম আলোতে ভিডিও (মোবাইল জার্নালিজম বা মোজো প্রতিবেদন) প্রতিবেদনের পর ক্রেতার আগমন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ক্রেতাদের গর্ব করে বলি, আমি এমএ পাস চাওয়ালা।
প্রশ্ন :
চা বিক্রিতে নামলেন কেন?
সহিদুল: চাকরি হারিয়ে। রাজধানীর বাড্ডায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসেবে চাকরি করতাম। করোনাকালে কর্তৃপক্ষ বেতন ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিতে চায়। ফলে সেই চাকরি করা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন :
এরপর কি চায়ের দোকান দিলেন?
সহিদুল: না। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে অর্ক টেক লিমিটেড নামে একটি অনলাইন (ই-লার্নিং) কোম্পানি খুলি। সেখানেও সুবিধা করতে পারিনি। সে সময় স্ত্রী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালানোর কথাও চিন্তা করি। তারপর চায়ের দোকান দিয়েছি।
প্রশ্ন :
‘এমএ পাস চাওয়ালা’ নাম কেন দিলেন?
সহিদুল: একটু চমক সৃষ্টি ও নিজের অবস্থান বোঝানোর জন্য নামটি দেওয়া।
প্রশ্ন :
আপনি এমএ পাস কোথা থেকে করেছেন? কত সালে?
সহিদুল: ২০১৩ সালে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ পাস করেছি।
প্রশ্ন :
দোকান চালুর পর আপনার অভিজ্ঞতা কেমন হলো?
সহিদুল: এমএ পাস করে সহিদুল চাওয়ালা হবে, দোকানে বসে চা বানাবে—বিষয়টি পরিবারের সদস্যসহ অনেকেই শুরুতে মানতে পারেননি। এখনো আত্মীয়দের কেউ কেউ দোকানে আসেন শুধু আমাকে নিয়ে হাসাহাসির জন্য। অপরিচিত অনেকে ফেসবুকে ট্রল (কটাক্ষ) করেন। মারমুখী আচরণের মুখেও পড়েছি।
প্রশ্ন :
কেউ উৎসাহ দেননি?
সহিদুল: যাঁরা উচ্চশিক্ষিত, তাঁরা কিন্তু বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছেন। দোকানে এসে বা অনলাইনে মন্তব্য করে উৎসাহ দিচ্ছেন। যাঁরা সমালোচনা করেন, তাঁদের মন্তব্য আমার কাছে সহনীয় হয়ে গেছে। উৎসাহের বিষয় হলো, আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন হওয়ার পর কয়েকটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আমার চায়ের দোকানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রশ্ন :
দোকানের চমক কি শুধু নামেই?
সহিদুল: না। চায়ের স্বাদেও চমক আছে। আমার দোকানে ইরানি জাফরান চা, ইরানি দুধ চা, ইন্ডিয়ান মালাই চা, স্পেশাল (বিশেষ) মাশালা চা, আমেরিকান চকলেট দুধ চাসহ নানা স্বাদের চা পাওয়া যায়। দাম প্রতি কাপ ৩০ থেকে ৭০ টাকা। চায়ের সঙ্গে আমার স্ত্রী শ্যামলী আক্তারের হাতে তৈরি মাংসের শিঙাড়াও পাওয়া যায়।
প্রশ্ন :
চা বানানো কোথায় শিখলেন?
সহিদুল: ২০১০ সালে পর্যটন করপোরেশন থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট (ব্যবস্থাপনা) বিষয়ে একটি কোর্স করার সূত্রে সোনারগাঁও হোটেলে তিন মাস শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সে অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগছে।
প্রশ্ন :
দোকানের সাজসজ্জায়ও তো ভিন্নতা দেখছি…
সহিদুল: নতুনত্ব আনতে পরিবেশবান্ধব পোড়ামাটির কাপ, বাটি, কাঠের ট্রে, পিতলের নানান বাহারি বাসনকোসন ব্যবহার করেছি। নিজের ছবি দিয়ে ‘এমএ পাস চাওয়ালা’ লিখে লাল-কালো টি-শার্টও বানিয়ে নিয়েছি। ফেসবুকে দোকানের নামে একটি পেজ এবং একটি ওয়েবসাইট চালু করেছি।
প্রশ্ন :
দোকান দিতে কোনো ঝামেলা হয়নি?
সহিদুল: ভাটারা আমার শ্বশুরবাড়ির এলাকা। এখানে আছি প্রায় ১৮ বছর। মাস্তানদের চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ঝামেলা মেটাতে সহায়তা করছেন আমার চাচাশ্বশুর শফিকুল ইসলাম। তিনি ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর।
প্রশ্ন :
দোকান কি নিজে একা চালান?
সহিদুল: একাই চালাতাম। ক্রেতা বাড়ায় বড় বোনের ছেলে আবু রায়হানের সহযোগিতা নিচ্ছি। সে ডিগ্রিতে পড়ে।
প্রশ্ন :
শুধু এই দোকান দিয়ে কি সংসার চলছে?
সহিদুল: না। সংসার চালাতে এখনো টিউশনি করি। দুপুরে পড়াই। দোকানের কাজে ব্যাঘাত না করে।
প্রশ্ন :
দোকান দিয়ে কি সফল হতে পারবেন বলে আশা করেন?
সহিদুল: আশা করি পারব। চায়ের দোকানটিই আমাকে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ভাটারায় যে জায়গায় মানুষের আনাগোনা বেশি, তেমন একটি জায়গায় দোকানটি স্থানান্তর করতে চাই। ভবিষ্যতে আমি আমার চা নিয়ে বিয়ে, গায়েহলুদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চাই।