চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের নেত্রী লাইলুন নাহার সেমির সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন মোরশেদুল ইসলাম, মানজারে হাসিন মুরাদ, মুনিরা মোরশেদ মুন্নী, ফরিদুর রহমান, জহিরুল ইসলাম, বেলায়াত হোসেন মামুন, মইনুদ্দীন খালেদ ও মাহবুব জামিলের স্ত্রী নাহার জামিল, তাঁর ছেলে রুবাইয়াত জামিল প্রমুখ।

চলচ্চিত্রকার মানজারে হাসিন মুরাদ বলেন, সজ্জন ব্যক্তি বলতে যা বোঝায়, মাহবুব জামিল ছিলেন সে রকম একজন মানুষ। যারা তাঁকে অশ্রদ্ধা করত, তাদেরও তিনি ক্ষমার চোখে দেখতেন, তাদের প্রতিও স্নেহশীল ছিলেন। বড় প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করতেন। এ বিষয়ে তিনি অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই প্রকাশিত হতো না। তাঁর পাণ্ডিত্য বোঝা যেত সেসব নিয়ে আলোচনার সময়। তাঁর প্রয়াণের খবর শোনার পর মনে হয়েছে, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া একটি অবারিত হাত সরে গেল।

মাহবুব জামিলের অবদানের কথা স্মরণ করে চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘দীপু নাম্বার টু’ ছবির বেশ কিছু অংশ আমি তাঁর বাড়িতে শুটিং করেছিলাম। একজন মানুষ উদার হলেই কেবল সিনেমার শুটিংয়ের জন্য নিজের বাড়িতে জায়গা দিতে পারেন। এমনকি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে সব সময় তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।

শিল্পসমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ বলেন, মাহবুব জামিল ছিলেন একজন লড়াকু মানুষ। তাঁর লড়াইটা আমরা হয়তো দেখতে পেতাম না। কারণ, ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টে অর্থ যোগান দেওয়া সহজ কথা নয়। এই মানুষগুলো থেকে থেকে আমাদের ভেতরে জেগে ওঠেন। জহিরুল হক বলেন, রুচি ও সৃজনশীলতার প্রতীক ছিলেন মাহবুব জামিল। শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা গড়ে তুলতে আমাদের তাঁর মতো মানুষ দরকার।

ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন বলেন, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি একজন সফল মানুষ। এই অঙ্গনে ছোটদেরও সম্মান করতে হয়, সেটি তাঁকে দেখে শিখেছি। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রংপুরের যে ছেলেটা কাজ করে যাচ্ছে, সে মাহবুব জামিলেরই একটি সংস্করণ। জামিল ভাইকে স্মরণীয় করে রাখতে হলে এই আন্দোলনকে সক্রিয় রাখতে হবে।

ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের সভাপতি লাইলুন নাহার সেমি মনে করেন, জীবনে ওপরে ওঠার সিঁড়িতে একজন মানুষ হাত বাড়িয়ে রাখেন। তাঁর জীবনের সেই মানুষটি হচ্ছেন মাহবুব জামিল। তিনি বলেন, ‘সত্তরের দশকে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে আমরা মাত্র তিনজন মেয়ে ছিলাম। ফিল্ম খুব একটা বুঝতাম না। কিন্তু এসবের সঙ্গে যারা জড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা যা করতেন সবকিছুই ভালো লাগত, আপন মনে হতো। জামিল ভাই তাঁদের অন্যতম। ব্যক্তিগত জীবনে কখনো বিপদে পড়লে তাঁর সহযোগিতা পেয়েছি। কেবল আমাকে ক্ষমতায়িত করাই নয়, অনেকের জীবনে ইতিবাচক ছোঁয়া রেখে গেছেন তিনি।’

স্মরণসভায় সিদ্ধান্ত হয়, মাহবুব জামিলের নামে প্রতিবছর তিনটি চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হবে। এ ছাড়া তাঁকে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ ও একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করা হবে সভা আয়োজকদের উদ্যোগে।

মাহবুব জামিলের ছেলে রুবাইয়াত জামিল বলেন, ‘বাবা বিজনেস কমিউনিটি, সরকারি দায়িত্ব ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই লড়াই করে বিজয়ী হয়েছেন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ধরে রেখে। আমরা নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর এই গুণগুলো ছড়িয়ে দিতে চাই। পাশাপাশি বাবার জীবনটাকে উদ্‌যাপন করতে চাই।’

মাহবুব জামিল ২০০৮ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদের বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ সময় তিনি মন্ত্রী পদমর্যাদায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়; শিল্প মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি সিঙ্গার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৫ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।