ডুবে মৃত্যু রোধে বাংলাদেশের উদ্যোগ বিদেশে প্রশংসিত 

পানিতে ডুবে মৃত্যুপ্রতীকী ছবি

ডুবে মৃত্যু রোধে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর করণীয় সম্পর্কে যে বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, সেটি ঘানায় কেন, এ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরেছিল। একটি হলো, পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশে ডুবে মৃত্যুর হার জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, আফ্রিকার দেশগুলোর নীতিনির্ধারকেরা মারাত্মক এই মৃত্যু রোধে কী করছেন, সেটি তুলে ধরা।

ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের কার্যকর উপায় কী, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঘানার রাজধানী আক্রায় তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক ও উন্নয়নকর্মীরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আয়োজিত এ সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে ঘুরেফিরে বারবার এসেছে একটি দেশের নাম—বাংলাদেশ। কারণ, বিশ্বজুড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে এখন যে দুটি কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে, তার কার্যকারিতা প্রথম বড় পরিসরে প্রমাণিত হয়েছিল বাংলাদেশেই।

আজ ২৫ জুলাই বিশ্ব ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগে ডুবে মৃত্যুর ধারা বদলাই’। সম্মেলনে যে সাতটি কৌশল তুলে ধরে বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বহু খাতভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখানে অনেকের উপস্থাপনাতেই উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা। তবে বৈপরীত্য হলো, যে দেশের অভিজ্ঞতা এখন বিশ্ব অনুসরণ করছে, সেই বাংলাদেশেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার অভাবে উদ্যোগগুলো বারবার থেমে গেছে।

শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখা ও জলাশয় নিরাপদ করে ডুবে মৃত্যু কমানো সম্ভব। দেশে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন বন্ধ।

বাংলাদেশের উদাহরণ কোনগুলো

পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু
প্রতীকী ছবি

ডুবে মৃত্যু রোধে কার্যকর কৌশলগুলোর অন্তত দুটির উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)।

সিআইপিআরবির ২০০৫ সালের গবেষণায় দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি ডুবে মারা যায় দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টার মধ্যে, যখন অভিভাবকেরা কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং শিশুরা নজরদারির বাইরে থাকে।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়, ওই সময় শিশুদের কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখা এবং বাড়ির আশপাশের জলাশয় নিরাপদ করলে বা বেড়া দেওয়া হলে ডুবে মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ গবেষণার ভিত্তিতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের বৈশ্বিক কারিগরি প্যাকেজে এ দুটি উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়। সিআইপিআরবি দেশের ৫১টি ইউনিয়নে কাজ করে সফলতা পেয়েছিল।

সিআইপিআরবি মোট ৩ হাজার ২০৫টি দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। ৯ থেকে ৪৭ মাস বয়সী ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৪টি শিশু এ কর্মসূচির আওতায় আসে। কর্মসূচি চলাকালে ওই সব এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার বেশ কমে গিয়েছিল।

কমিউনিটিকে কীভাবে সম্পৃক্ত করতে হয়, সেটা বাংলাদেশ আমাদের শিখিয়েছে। আমরা সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছি।
হোয়েন দোয়ান, ভিয়েতনামের গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের প্রতিনিধি

বিশ্ব শিখেছে বাংলাদেশ থেকে

সিআইপিআরবির এ প্রমাণভিত্তিক গবেষণায় সাহায্য করেছিল ইউনিসেফ। পরে সরকারিভাবে আর কোনো সহায়তা না পাওয়ায় এটি আর এগোয়নি। বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশের এ উদ্যোগ স্মরণ রেখে কাজ করেছে।

ঘানার সম্মেলনে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল হেলথ ইনকিউবেটরের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কনসালট্যান্ট অনিউম চার্লস ওটাও কখনো বাংলাদেশ যাননি। তিনি উগান্ডার নাগরিক। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন ডুবে মৃত্যু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শিকার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা। উগান্ডায় চিত্রটি ভিন্ন। এখানে এই বয়সী শিশুদের মৃত্যু ১১ শতাংশ, আর ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ। তবে আমরা যখন উগান্ডায় কাজ শুরু করি, তখন আমাদের জ্ঞানভান্ডার তৈরিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে।’

আরও পড়ুন

ভিয়েতনামে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) প্রতিনিধি হোয়েন দোয়ান বলেন, ‘কমিউনিটিকে কীভাবে সম্পৃক্ত করতে হয়, সেটা বাংলাদেশ আমাদের শিখিয়েছে। আমরা সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছি।’ তিনি জানান, আট বছর আগে ভিয়েতনামে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে বছরে প্রায় দুই হাজার ডুবে মারা যেত। এখন জাতীয় পর্যায়ে সেই হার ১০ শতাংশ কমেছে। আর যেসব এলাকায় তাঁদের কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে কমেছে ১৬ শতাংশ।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ডুবে মৃত্যু, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যু, এখনো বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতিবছর ৯ হাজারের বেশি শিশু ডুবে মারা যায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সুন্দরবন অঞ্চল।

পশ্চিমবঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউটের (সিএনআই) প্রধান কর্মসূচি কর্মকর্তা মেঘেন্দ্র ব্যানার্জি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এখন একটি বৈশ্বিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমরা বাংলাদেশ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর অভিজ্ঞতাও কাজে লাগিয়েছি। তবে বাংলাদেশের অর্জনকে অগ্রাহ্য করার কোনো কারণ নেই।’

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শিকার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা। উগান্ডায় চিত্রটি ভিন্ন। এখানে এই বয়সী শিশুদের মৃত্যু ১১ শতাংশ, আর ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ। তবে আমরা যখন উগান্ডায় কাজ শুরু করি, তখন আমাদের জ্ঞানভান্ডার তৈরিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল হেলথ ইনকিউবেটরের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কনসালট্যান্ট অনিউম চার্লস

ধারাবাহিকতা থাকেনি

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি। ডুবে মৃত্যু যখন অনেক বেশি আকার ধারণ করেছিল, সে সময় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটিবেজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেফ ফ্যাসিলিটিজ (আইসিবিসি)’ প্রকল্প শুরু করে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটি চলে ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায়।

কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনকে এ কাজ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ২৫ হাজার শিশুকে নিয়ে কাজ করে। সেখানে শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ছিল না বললেই চলে। এখন আরও ১৪টি জেলাকে যুক্ত করে ৩০ জেলায় প্রকল্পটি নতুন করে শুরু করার কথা গত মে মাসে প্রথম আলোকে বলেছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

সিআইপিআরবির গবেষক আল-আমিন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের কাজটি কোনো একক মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে নিলে ফলপ্রসূ হবে না। স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, নারী, শিশুবিষয়কসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

আরও পড়ুন