যন্ত্রপাতি অচল, নেই চিকিৎসাসেবা

হাসপাতালের বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি অচল। ফলে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না ২২ জেলার রোগীরা। ভবনগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত হয়নি।

  • হাসপাতালের জন্য ১২৬ ধরনের যন্ত্রপাতি কেনা হয়। ভবন নির্মাণের আগেই কেনা এসব যন্ত্রের বেশির ভাগই হয় অচল, নয়তো মেয়াদোত্তীর্ণ।

  • ৯১ চিকিৎসক পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ২৮ জন। ৬৩ পদই শূন্য। রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম অবস্থা।

গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হাসপাতালটির কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে। সম্প্রতি তোলা ছবি
প্রথম আলো

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা ইউনিয়নের সোহরাব মোল্লার ছেলে মো. সবুজ দীর্ঘদিন ধরে চোখের ছানির সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসকের পরামর্শে ছেলের চোখের অস্ত্রোপচারের জন্য যান জেলার শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, অ্যানেসথেসিয়া যন্ত্র (অবেদনযন্ত্র) নষ্ট। অস্ত্রোপচার করা যাবে না। পরে ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে তিনি ছেলের চোখের ছানির অস্ত্রোপচার করান।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ১২০ শয্যার শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৬ সালে। প্রধানমন্ত্রী ওই বছরের ১৬ এপ্রিল হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। উপজেলার গোবরা ইউনিয়নে ১৫ একর জায়গায় হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ১৭৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের জন্য ১২৬ ধরনের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল। এসব যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই এখন বিকল। এর মধ্যে রয়েছে অবেদনযন্ত্র, এক্স-রে মেশিন, স্ক্রিন আলট্রাসনোগ্রাম, অটো লেন্সম্যাটার, রেটিনোসকোপও। ভবন নির্মাণের আগেই যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে।

‘আমরা ভবন হস্তান্তরের চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করছে না।’ ভবনে কোনো ত্রুটি নেই দাবি করে তিনি বলেন, ভবনগুলো ব্যবহার না করলে দিন দিন সমস্যা বাড়বে।
কাজী আবু হানিফ, গণপূর্ত অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী

২ মে সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের অবেদনযন্ত্রের আটটির মধ্যে সাতটি অকেজো। নেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ। ফ্যাকো ও মাইক্রোস্কোপ মেশিনের অভাবে রোগীদের সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালে ৯১ চিকিৎসক পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ২৮ চিকিৎসক। ৬৩টি পদই শূন্য।

হাসপাতালের পরিচালক নাহিদ ফেরদৌস স্বীকার করেন, হাসপাতালে অনেক যন্ত্রপাতি অচল থাকায় অনেক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। রয়েছে চিকিৎসক–সংকটও। এই সংকট কাটাতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে না।

জানা গেছে, নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব ভবন বুঝে নেয়নি। ভবন হস্তান্তর নিয়ে ছয় বছর ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের চিঠি চালাচালি চলছে। দুই বিভাগের কর্মকর্তাদের গড়িমসিতে ভবনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী আবু হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভবন হস্তান্তরের চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করছে না।’ ভবনে কোনো ত্রুটি নেই দাবি করে তিনি বলেন, ভবনগুলো ব্যবহার না করলে দিন দিন সমস্যা বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রীর এলাকার প্রকল্পের যদি এই হাল হয়, তাহলে অন্য জেলার কী অবস্থা, তা সহজে অনুমেয়। ছয় বছরেও চিকিৎসক নিয়োগ না দেওয়া সরকারের ব্যর্থতা।
সৈয়দ আবদুল হামিদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের

তৃতীয় পক্ষের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে অনিয়ম

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ইউনিকনসাল্ট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিবেদন আইএমইডিতে জমা দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনেও হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অসংগতি উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবন নির্মাণের আগেই হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। হাসপাতাল চালুর পর অনেক যন্ত্রপাতি অচল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন ও ডিহিউমিডিফায়ারের একটি ইউনিট, সেন্ট্রাল অক্সিজেন, সিটি স্ক্যান, এমআরআই মেশিন অকেজো হয়ে গেছে।

সাইট ল্যাম্প মাইক্রোস্কোপের এক ইউনিট ও একটি অটো রিফ্রোকোমিটার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অকেজো হয়ে আছে সাইট ল্যাম্প, স্ক্রিন আলট্রাসনোগ্রাম, নন কনটাক্ট বায়োমেট্রি ও অটো লেন্সম্যাটার। রেটিনোস্কোপের একটি ইউনিট কাজ করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এলাকার প্রকল্পের যদি এই হাল হয়, তাহলে অন্য জেলার কী অবস্থা, তা সহজে অনুমেয়। ছয় বছরেও চিকিৎসক নিয়োগ না দেওয়া সরকারের ব্যর্থতা। প্রকল্পের ভবন নির্মাণে কোনো অনিয়ম হলে বাস্তবায়নকারী সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরকে জবাবদিহি করতে হবে। এসব ভবনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার কে নেবে।