বারটানের নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুল ওয়াদুদ নিজেও প্রতিষ্ঠানটির বাইরে প্রচার কম বলে স্বীকার করলেন। তবে বললেন, তাঁরা পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন। পুষ্টির বিষয় নিয়ে এখন তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন। এখন মানুষ আস্তে আস্তে জানতে পারবে।

পুষ্টিবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা বারটানের প্রধান দুই কাজ হচ্ছে পুষ্টি নিয়ে গবেষণা ও মানুষকে প্রশিক্ষণ। তবে গবেষণা শুরু করতে লেগে গেছে যাত্রা শুরুর পর ৫০ বছর। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করতে লেগেছে ৪৫ বছর। আর ৫৩ বছর পর পেয়েছে নিজস্ব কার্যালয়, গবেষণা মাঠ ও গবেষণাগার।

যাত্রা শুরু ৫৪ বছর আগে

কৃষি মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বাজেটের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রশাসনিক নির্দেশনায় ঢাকার জুরাইনে ‘ফলিত পুষ্টি’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৬৮ সালে বারটানের যাত্রা শুরু হয়। উদ্দেশ্য জনগণের পুষ্টির উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (বারটান) রূপান্তর করা হয়। ইনস্টিটিউট করা হলেও চলছিল প্রকল্প আকারেই। ১৯৯৪ সালে প্রকল্পটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর করা হয়।

২০০০ সালে বারটানকে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বোর্ড হিসেবে নামকরণ করা হয়। পরে ২০১২ সালে আইন পাস হলে বোর্ডকে আবার বারটান নামকরণ করা হয়।

২০২১ সালের ১ জুলাই ঢাকার সেচ ভবন থেকে বিশনন্দীতে বারটানের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ও এখানে। ঢাকা ছাড়াও সাত বিভাগে সাতটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।

সারা দেশে বারটানের মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৫৭ একর। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয়ের জমির পরিমাণ ১০০ একর, বাকি প্রায় ৫৭ একর জমি নিয়ে সাতটি আঞ্চলিক কার্যালয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৮ সালে ৫৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার পর মূলত গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরালো হয়।

বারটানের নির্বাহী পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জনগণের পুষ্টি স্তর উন্নয়নের চেষ্টা করছি। আগামী এক বছর এত বেশি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ হবে যে কর্মকর্তারা বসে থাকার সময় পাবেন না।’

বারটানের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, বারটান পুষ্টি নিয়ে কাজ করে। বিষয়টি এমন না যে পুষ্টি কম হওয়ায় কোনো মানুষ এখনই মারা যাচ্ছে। যেমন খাটো জনগোষ্ঠীকে পুষ্টি দিয়ে লম্বা করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। এ ধরনের কাজে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে।

পুষ্টিহীন মানুষ রয়ে গেছে

দীর্ঘ প্রায় ৫৪ বছর ধরে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণের পুষ্টি স্তর উন্নয়নের ভিশন ও মিশন নিয়ে বারটান কাজ করলেও এখনো দেশে প্রচুর পুষ্টিহীন মানুষ রয়ে গেছে।

দেশের প্রতিটি উপজেলার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যা—খর্বাকৃতি, ওজনস্বল্পতা, কৃশকায় ও স্থূলতার ভিত্তিতে মানচিত্র তৈরি করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ‘বাংলাদেশের অপুষ্টি মানচিত্র ২০১৯’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, প্রতিটি উপজেলায় শিশুরা অপুষ্টিজনিত এই চার রোগে ভুগছে। এর মধ্যে খর্বাকৃতি ও ওজনস্বল্পতার সংকট সবচেয়ে বেশি।

মানচিত্রে দেখা যায়, ঢাকা, সিলেট, পঞ্চগড়, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী ও বরিশালে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৫ থেকে ১৭ ভাগ শিশু অতি খর্বাকৃতির। সিলেট, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, পঞ্চগড়, বান্দরবানসহ ১৩টি জেলায় প্রায় ৮ থেকে ১০ ভাগ শিশু অতি ওজনস্বল্পতায় ভুগছে। দিনাজপুর, নওগাঁ, মেহেরপুর ও হবিগঞ্জের এই বয়সের প্রায় চার ভাগ শিশু অতি কৃশকায়। অতি স্থূলতা প্রতিটি উপজেলায় থাকলেও তা কম।

বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অবস্থায় ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের ক্ষুধা ও অপুষ্টির অবসানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন বেশ চ্যালেঞ্জিং।

সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে একটি করে পুরি, বেগুনি ও পেঁয়াজু খান বেসরকারি চাকরিজীবী শামীম হোসেন। এতে তাঁর খরচ হয় ৩০ টাকা। এই টাকা দিয়ে তিনি পাশের দোকান থেকেই একটি ডিম ও একটি কলা খেতে পারতেন। কিংবা এক কেজি আমড়া কিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে খেতে পারতেন। শামীম বলেন, ক্ষতিকর জেনেও এসবই খেতে ইচ্ছে করে।

বারটানের প্রশিক্ষকেরা বলছেন, মানুষ ভাজাপোড়া না খেয়ে বা ধূমপান না করে সেই টাকায় পুষ্টিকর খাবার খেলে পুষ্টিঘাটতি কমবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

৫০ বছর পর গবেষণা

প্রধান কাজ গবেষণা হলেও বারটান প্রথম গবেষণা করে প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ওই বছর বারটান ১২টি গবেষণা করে। ২০১৮-১৯ থেকে সর্বশেষ ২০২১–২২ পর্যন্ত চার অর্থবছরে মোট ৪৪টি গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণার মধ্যে ছয়টি বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। চলতি অর্থবছর ২৫টি গবেষণার প্রস্তাব রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত নিজস্ব প্রধান কার্যালয় পাওয়ার পর গবেষণায় জোর বেড়েছে।

প্রধানসহ ১২ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার গবেষণা নেই

বারটানের ৩২ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের কাজ গবেষণা। তবে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জ্যোতি লাল বড়ুয়াসহ ১২ জনের কোনো গবেষণা নেই। জ্যোতি লাল ২৯ বছর ধরে বারটানের কর্মরত। কয়েক মাস পর তিনি অবসরে যাবেন। জ্যোতি লাল বলেন, ‘গবেষণার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে গত বছর। তাই আমার সুযোগ হয়নি। আমি শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েছি।’

এ ছাড়া আরও ১১ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কোনো গবেষণা নেই। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদের মো. সামসুজ্জোহা ও ইলোরা পারভীন এবং সিরাজগঞ্জ কার্যালয়ের মোরসালীন জেবীনের গবেষণা নেই।

এ ছাড়া বারটানের প্রধান ও আঞ্চলিক কার্যালয় মিলিয়ে সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের আটজনের কোনো গবেষণা নেই। ৪৪টির মধ্যে তিনটি গবেষণা যৌথভাবে হয়েছে। তাতে সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদের কারও নাম নেই।

গবেষণায় খরচ মাত্র ৩.২৫ ভাগ

গত অর্থবছরেই সবচেয়ে বেশি—১৫টি গবেষণা করে বারটান। এই অর্থবছরে গবেষণায় ব্যয় হয় ৪৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বেশি, যা বারটানের মোট ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ২৫ ভাগ।

কর্মকর্তারা বলছেন, চার বছর আগে গবেষণায় কোনো খরচই ছিল না। এখন কিছু কিছু গবেষণা হচ্ছে বলে এই খাতে খরচ হচ্ছে। গবেষণা বাড়াতে আরও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন আরও বেশি গবেষণা হবে, এ খাতে ব্যয়ও বাড়বে।

এর বাইরে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে প্রশিক্ষণে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, গত অর্থবছরে বড় অংশই খরচ হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খাতে।

প্রশিক্ষণও চলছে ঢিলেঢালা

বারটান এক দিন ও তিন দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। প্রান্তিক মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, মাঠপর্যায়ের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেন তাঁরা অন্যদের মধ্যে পুষ্টিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে পারেন। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যেককে দৈনিক ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়।

গত পাঁচ অর্থবছরে (২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২) মোট ৬৩ হাজার ৮২ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বারটান। তার আগের আট অর্থবছরে (২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭) ১৮ হাজার ৩৮০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর আগের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি বারটান।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, শুরু থেকে খুব সীমিত পরিসরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ২০১৮ সালে জনবল নিয়োগের পর মূলত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে
গতি আসে।

বারটান থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের মো. মকবুল হোসেন মোল্লা। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষের দিনে কী পরিমাণ পানি, শাকসবজি, দুধ, ডিম, লবণ, চিনি ইত্যাদি খাওয়া দরকার, প্রশিক্ষণে তা জানতে পেরেছি। কোন বয়সে কার কী খাওয়া উচিত, তা–ও জেনেছি। আমি মনে করি, দেশের প্রতিটি নাগরিককে এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।’

শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি

বারটানের আরেকটি অন্যতম কাজ ফলিত পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান বিষয়ে সনদ ও ডিপ্লোমা কোর্স বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুষ্টিবিষয়ক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। তবে এখনো এর অগ্রগতি নেই।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সনদ ও ডিপ্লোমা কোর্স বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই। কোর্সের পাঠক্রম কী হবে, সেটা নিয়ে কেবল আলোচনা হচ্ছে।

সম্প্রতি আড়াইহাজারে বারটানের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সনদ ও ডিপ্লোমা কোর্স চালুর জন্য একটি পাঁচতলা ভবন করা হয়েছে। তবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এখন সেখানে বারটানে নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার থাকছেন।

বোর্ড সভা হচ্ছে না

বারটানের ১৯ সদস্যের একটি পরিচালনা বোর্ড রয়েছে। আইন অনুযায়ী, ২০১২ সালে গঠিত বোর্ডের চেয়ারম্যান কৃষিমন্ত্রী। আইনে রয়েছে, প্রতিবছর দুবার বোর্ডের সভা করতে হবে। বারটানের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১২ সালে বোর্ড গঠনের পর এ পর্যন্ত ১৭টি সভা হয়েছে। সর্বশেষ সভা হয়েছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সম্প্রতি সভা করার উদ্যোগ নিয়েছে বারটান।

সমাধান কীভাবে

প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পর পুরোদমে কাজ শুরু করলেও এখনো প্রতিষ্ঠানের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ফলে মানুষ প্রতিষ্ঠানটি থেকে সুফল পাচ্ছে না। কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়ছে না পুষ্টি স্তর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হলেও অবকাঠামো আরও বাড়াতে হবে। জনবল নিয়োগ দিতে হবে। মানুষকে পুষ্টিসচেতন করতে হলে গবেষণা ও বেশ বেশি প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। এ জন্য সরকারকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

বারটানের সাবেক দুই নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান ও মো. আবদুল কাদের বলেন, জনগণকে সচেতন করতে যে পরিমাণ গবেষণা করা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, তার তুলনায় এখন জনবল কম। দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই জনবলকে কাজে লাগাতে হবে।