সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৪: এইচআরএসএস

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)

সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৪ জন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, নির্বাচন, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

আজ শনিবার গণমাধ্যমে এইচআরএসএসের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত মাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটি ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, নিজেদের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ হিসাব করেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরের ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৫টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৩৪০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষের ঘটনায় ৬১ জন আহত এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষের ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটি সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে তিনটি ঘটনায় ১৬ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে সাতটি ঘটনায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। এর বাইরে বিভিন্ন দলের মধ্যে আরও সাতটি সহিংসতার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত চারজনের মধ্যে আওয়ামী লীগের দুজন, বিএনপির একজন ও জামায়াতের একজন রয়েছেন।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক দুটি সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।

২৮৭ ঘটনায় গ্রেপ্তার ২১ হাজারের বেশি

রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে যৌথ ও বিশেষ অভিযানে সেপ্টেম্বর মাসে ২৮৭টি ঘটনায় অন্তত ২১ হাজার ২০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৬৬৫, বিএনপির ৬২, জামায়াতে ইসলামীর ৩১ এবং এনসিপির একজন নেতা-কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া উগ্রপন্থী সংগঠনের ২৪ সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।

বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এ মাসে ২৩টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৬৮৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

‘মব সহিংসতায়’ নিহত ৯

সেপ্টেম্বরে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্‌বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ‘মব সহিংসতা ও গণপিটুনির’ ৩৫টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ১২টি হামলার ঘটনায় সাতজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে বিএনপির পাঁচজন, জামায়াতের একজন ও একজন চরমপন্থী নিহত হয়েছেন।

৩৫ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার

সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ২০টি ঘটনায় ৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন আহত, ১২ জন লাঞ্ছিত এবং ৩ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া চারটি মামলায় তিন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার সুরক্ষা আইনে করা একটি মামলায় একজনকে আটক করা হয়েছে।

সভা-সমাবেশে বাধারও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি সভা ও সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এসব ঘটনায় ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনায় ১২টি মামলা ও ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।

কারাগারে ২১ বন্দীর মৃত্যু

সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ২১ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন কয়েদি ও ১০ জন হাজতি। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ২ জন আওয়ামী লীগের এবং ১৯ জন সাধারণ বন্দী ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত ও নির্যাতনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। তাঁদের মধ্যে একজন নির্যাতনে এবং দুজন হেফাজতে মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার

সেপ্টেম্বর মাসে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। তাঁদের মধ্যে ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের ৪৭ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

পারিবারিক সহিংসতায় ৪৩ নারী নিহত, ২৭ জন আহত এবং ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় ছয়জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে ২৭১ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১৯৩ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া সাত শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সীমান্ত মৃত্যু

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হামলায় দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন বলে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকা থেকে একজনকে আটক এবং বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শতাধিক ব্যক্তিকে পুশ ইনের চেষ্টার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে একজন বাংলাদেশি জেলে আহত হয়েছেন।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

ইজাজুল ইসলাম মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।