প্রবীণদের অবসরজীবন সুন্দর-উপভোগ্য করে তোলে এই প্রতিষ্ঠান

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালের অ্যাপার্টমেন্ট কক্ষেই চলছে নিয়মিত পরীক্ষাছবি: খালেদ সরকার

নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা আর কাজ করছে না। জীবনের সময় ঘনিয়ে আসছে—এমন অবস্থায় প্রবীণ ব্যক্তির হসপিস সেবার প্রয়োজন হয়। এমন সময়ে প্রবীণ ব্যক্তির আকাশ, ফুল দেখার ইচ্ছা হতে পারে। ইচ্ছা হতে পারে পাখির কলতান শুনতে। তখন হসপিস সেন্টারের বিছানাকে ঠেলে নেওয়া হবে ছাদে। যতক্ষণ মন চায়, প্রবীণ ব্যক্তি প্রকৃতি উপভোগ করবেন। শেষজীবনকে এভাবে উপভোগ করবেন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা রোডে (পূর্বাচলের কাছে) শীতলক্ষ্যা নদীর একদম কাছেই প্রবীণ ব্যক্তিরা এমন নানান সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন জাপান–বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালে (জেবিএফআরএইচ)।

প্রবীণবান্ধব প্রতিষ্ঠানটির সাদা ধবধবে পাঁচতলা করে চারটি ভবন আছে। এগুলোর নাম—পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুরমা। সব কটি ভবন থেকেই করিডরের মাধ্যমে ছাদে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন
ছবি: খালেদ সরকার

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে, হুইলচেয়ারে চড়ে বা লিফটে উঠে ভবনের বাসিন্দারা ছাদে যেতে পারেন। সেখানে গেলে যাতে তাঁদের মন ভালো হয়, সে জন্য বাহারি ফুল, লতাগাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে ছাদ।

প্রতিষ্ঠানটির আশপাশে আর তেমন কোনো সুউচ্চ ভবন না থাকায় এখনো চারপাশটা অনেকটাই সবুজ রয়েছে।

প্রবীণদের সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এখানে ২৩২টি অত্যাধুনিক স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট আছে। অ্যাপার্টমেন্টে বসেই প্রবীণেরা সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ কেয়ারগিভারদের তত্ত্বাবধানে পরিচর্যা পাচ্ছেন।

আবার পুষ্টিবিদদের তত্ত্বাবধানে পরিপাটি করে সাজানো খাবার পৌঁছে যাচ্ছে প্রবীণদের অ্যাপার্টমেন্টে, অ্যাপার্টমেন্টে।

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক সরদার এ নাঈম
ছবি: খালেদ সরকার

প্রবীণদের জন্য এখানে রয়েছে সুইমিংপুল, জ্যাকুজি, স্টিমবাথের ব্যবস্থা। আছে জিম বা ব্যায়ামাগার, নানান পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য ল্যাব, ফিজিওথেরাপি সেন্টার, লাইব্রেরি, মুভি থিয়েটার, যোগব্যায়ামসহ স্পিরিচুয়াল ওয়েলনেস সেন্টার, খেলার জায়গা, আড্ডা দেওয়া বা সময় কাটানোর জন্য বসার জায়গা, হাঁটার জায়গা।

সবাই মিলে রিভার ক্রুজে যাওয়ারও ব্যবস্থা আছে এখানে। বিছানাকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রবীণ বা হুইলচেয়ারকেন্দ্রিক প্রবীণদের জন্য ১৫০ শয্যার কেয়ার সেন্টার, মৃত্যুপথযাত্রী প্রবীণদের জন্য ৮০ শয্যার পেলিয়েটিভ কেয়ার, টার্মিনাল কেয়ার ও হসপিস কেয়ারের ব্যবস্থা তো আছেই।

জেবিএফএইচের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক সরদার এ নাঈম। তিনি জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেক্টমি সার্জারি শুরু করা সরদার এ নাঈম এই হাসপাতালের প্রফেসর অব সার্জারি ও চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

সরদার এ নাঈম প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রতিষ্ঠান গতানুগতিক প্রবীণনিবাসের মতো নয়। এখানে প্রবীণ ব্যক্তিরা সার্বক্ষণিক সেবাযত্ন পাচ্ছেন। তবে এখানে সব প্রবীণের সেবা নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, যাঁরা উচ্চবিত্ত, যাঁদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো, তাঁদের জন্যই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছে।

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালের ছাদ
ছবি: খালেদ সরকার

২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রতিবেদন বলছে, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯। তাঁরা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।

দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রাক্কলন বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা হবে ৩ দশমিক ৬ কোটি। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, অসুস্থতার কারণে অনেক প্রবীণ ক্রমেই একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন। অন্যদের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। প্রতিবেদনে প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যাসংশ্লিষ্ট সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পাশাপাশি ডিপ্রেশন, আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক যত্নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সরদার এ নাঈম জানালেন, জাপানে পিএইচডি করার সময় সেখানকার প্রবীণবান্ধব নানান কার্যক্রম দেখেছেন তিনি। তখনই ভাবেন, সুযোগ পেলে প্রবীণদের জন্য কিছু করবেন। জাপানের কয়েকজন বন্ধু এখন তাঁর নানা কাজে, উদ্যোগে পাশে থাকছেন।

শুধু বিনিয়োগ নয়; প্রযুক্তি জ্ঞান, প্রশিক্ষণসহ নানান কাজে সহায়তা করেন এই বন্ধুরা। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই সরদার এ নাঈমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘জাপান’ শব্দটি যুক্ত থাকে। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য তিনি জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ নার্সিং কলেজ, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ফিজিওথেরাপি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন।

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালে থাকা সুইমিংপুল
ছবি: খালেদ সরকার

প্রবীণদের অবসরজীবনের গল্প

১৭ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জেবিএফআরএইচ ক্যাম্পাসে অনেক প্রবীণের সঙ্গে দেখা হয়। অনেকেই নাম–পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি। আবার অনেকে খোলামেলাভাবে জানিয়েছেন নিজেদের জীবনের গল্প। অনেকে এসেছেন প্রতিষ্ঠানটি দেখতে, খোঁজখবর নিতে।

সরদার এ নাঈম প্রথম আলোকে বলেন, জেবিএফআরএইচ হচ্ছে তাঁর ও তাঁর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। আশা ইসলামের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই প্রতিষ্ঠানে থাকা শুরু করেন।

জামাতা সরদার এ নাঈম জানালেন, তাঁর শ্বশুরের আলঝেইমার রোগ আছে। তিনি ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে যেতেন। এ নিয়ে নানা সমস্যা হতো। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যান্য শারীরিক জটিলতা। তবে এখানে আসার পর তাঁর সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের রুমে ঢুকে প্রথম আলোর পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে হাসিমুখে তিনি স্বাগত জানালেন। বাংলাপিডিয়ার অনেকগুলো খণ্ড তাঁর রুমে সাজিয়ে রাখা। স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নানান ছবির একটি অ্যালবাম টেবিলে। দেয়ালে ফ্রেমে সিরাজুল ইসলামের তরুণ বয়সের সাদাকালো একটি ছবি। টেলিভিশন, ওভেন, নিজের বাসা থেকে আনা একটি আরাম কেদারাসহ নানান জিনিস দিয়ে সাজানো দুটি রুম। ঝলমলে রোদ এসে পড়েছে ছোট একটি বারান্দায়।

সিরাজুল ইসলাম জীবনের অনেক স্মৃতি ভুলে গেছেন। স্ত্রীর নাম মির্জা বানু, তা তাঁর মনে আছে। স্ত্রী মারা গেলেও তিনি ভাবেন, বেঁচে আছেন।

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালের অ্যাপার্টমেন্টে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম
ছবি: খালেদ সরকার

প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক মহসীন কবিরের দিকে তাকিয়ে সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘তুমি তো আমার স্ত্রীকে দেখেছ?’ মহসীন কবির ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়েন। তারপর সিরাজুল ইসলাম প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জির নাম শুনেছ?’ উত্তর নিজেই দিলেন।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটা ছবি তোলা হলো। সিরাজুল ইসলাম নিজের ছবি দেখে ছোট বাচ্চাদের মতো খুশি হলেন।

প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক মহসীন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ডিমেনসিয়াসহ এমন রোগীরা যা বলবেন, তাতেই সায় দিতে হবে। নেতিবাচক কিছু বলা যাবে না। অনেকেই বায়না ধরেন বাড়ি যাবেন। তখন কেয়ারগিভার তাঁদের নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দিক ঘুরিয়ে আবার ঘরে নিয়ে আসেন। এতে প্রবীণ ব্যক্তি ভাবেন, তাঁকে বাড়ি আনা হয়েছে। এই কাজগুলো আসলে বাড়িতে সার্বক্ষণিকভাবে করা সম্ভব না।

সিরাজুল ইসলামের মতো প্রতিষ্ঠানটির অ্যাপার্টমেন্টে বর্তমানে মোট ২২ জন নিয়মিতভাবে বসবাস করছেন। একেক অ্যাপার্টমেন্টে স্বামী ও স্ত্রী দুজন থাকতে পারেন। ৭০০ স্কয়ার ফিটের ৫ তারকা মানের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের সর্বমোট মাসিক খরচ ৮৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে মাসিক ভাড়া ৫০ হাজার টাকা। প্রতিদিন পাঁচ বেলা খাবার (দুবার নাশতাসহ) ২৪ হাজার টাকা। প্রতিদিন রুমে দুই বেলা চিকিৎসক, নার্স দেখে আসবেন, ডায়াবেটিস–উচ্চরক্তচাপসহ নানান কিছু পরীক্ষা করা হবে, সে বাবদ মাসিক খরচ ১০ হাজার টাকা। এর বাইরে কারও যদি কেয়ারগিভার লাগে তাহলে ১২ ঘণ্টার জন্য মাসিক খরচ হবে ৩০ হাজার টাকা। ২৪ ঘণ্টার জন্য কেয়ারগিভার নিলে লাগবে ৬০ হাজার টাকা। আর দৈনিক ভিত্তিতে নিলে লাগবে ২ হাজার টাকা।

জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালের অ্যাপার্টমেন্টে সাবেক রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের ও তাঁর স্ত্রী রিফাত সুলতানা
ছবি: খালেদ সরকার

প্রতিষ্ঠানটিতে দৈনিক ভিত্তিতে প্রবীণ ব্যক্তিদের থাকার সুযোগ আছে। একা থাকলে থাকা–খাওয়ার জন্য খরচ ৫ হাজার টাকা। দুজন থাকলে ৬ হাজার টাকা।

ছেলেমেয়েরা কয়েক দিনের জন্য বিদেশে গেলে অনেক সময় মা–বাবাকে এখানে রেখে যান বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এখানে অ্যাপার্টমেন্ট কেনারও সুযোগ পাচ্ছেন প্রবীণেরা। ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে ২০২টি এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তবে সবাই থাকা শুরু করেননি বা ভাড়া হয়নি।

সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আকরামুল কাদের (৮৩) ও তাঁর স্ত্রী রিফাত সুলতানা একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। তাঁদের এক ছেলে অস্ট্রেলিয়া, এক মেয়ে মালয়েশিয়ায় থাকেন।

আকরামুল কাদের জানালেন, তাঁর স্ত্রীর ডিমেনসিয়া। বাসায় থাকলে কাজের লোক পাওয়া যায় না। পুরো বাড়ি দেখভাল করার ক্ষেত্রে ঝামেলা আছে। তাই নিজের বাড়ি বিক্রি করে এক বছর ধরে তাঁরা এখানে থাকছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, তাঁর স্ত্রী মিশেল ওবামাসহ বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে আকরামুল কাদের–রিফাত সুলতানার ছবিগুলো ফ্রেমে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। আকরামুল কাদেরের মেয়ের আঁকা একটি ছবি টেবিলে রাখা। রিফাত সুলতানা তাঁর মায়ের সঙ্গে ভাইবোনদের ছবি দেখালেন। দেখালেন নাতিদের সঙ্গে ছবি।

আকরামুল কাদের বললেন, ‘প্রথম দিকে এখানে থাকতে খারাপ লাগত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। বাসায় স্ত্রীকে দেখভাল করা সমস্যা হচ্ছিল। টেলিভিশন দেখে, পত্রিকা পড়ে সময় কেটে যায়। কাগজ দিয়ে ফুল বানানোসহ নানান কাজে স্ত্রীকে ব্যস্ত রাখা হয়। এভাবেই দিন–রাত পার হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মাঝেমধ্যে দেখতে আসে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। তবে মাসের খরচের চিন্তাটা তো মাথায় রাখতেই হয়।’

ঈদের দিনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রবীণদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন রেখেছে। প্রবীণদের অনেকেই আত্মীয়ের বাড়ি যাবেন। কারও কারও ছেলেমেয়ে এসে নিয়ে যাবেন। এভাবেই ঈদের দিনটি পার হবে বলে জানা গেল। ঈদের পরে প্রবীণদের ক্যাম্পাসের বাইরে ঘোরাতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে প্রতিষ্ঠানটির।

অনেকে এখানে দেখতে আসছেন ভবিষ্যতে থাকার জন্য
ছবি: খালেদ সরকার

তাঁরা এসেছেন দেখতে

গত মঙ্গলবার ছোট ভাই ও এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেখতে এসেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনি জানালেন, তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে। তাঁরা প্রতিষ্ঠিত। নিজের বাড়িতে এখানকার মতো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার উপায় নেই। তাই স্ত্রীকে নিয়ে থাকার জন্য এখানকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অবসর জীবনটাকে একটু আরামে উপভোগ করতে চাচ্ছেন তাঁরা।

৬১ বছর বয়সী দেলোয়ারা খানম দুই বান্ধবীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেখতে এসেছিলেন। চাকরি থেকে অবসরের পর বর্তমানে ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দেলোয়ারা। তিনি জানালেন, তাঁর এক ছেলে ও ছেলের বউ আছে। তিনি সব সময় নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নেন। ছেলেকে সেভাবেই বড় করেছেন। তাই তিনি তাঁর অবসরজীবন কোথায়, কাদের সঙ্গে কাটাবেন, তা একান্তই তাঁর নিজস্ব ব্যাপার। তবে এখানে যেহেতু খরচটা একটু বেশি, তাই মানসিকভাবে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়েই থাকা শুরু করতে হবে।

সরদার এ নাঈম প্রথম আলোকে বলেন, প্রবীণ ব্যক্তি দুই দিন আগে বা পরে মারা যাবেন, কোনো ভবিষ্যৎ নেই—এমন ভাবনায় কেউ সহজে এই ব্যক্তিদের উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে চান না। বিনিয়োগ করলেও তা লাভজনক করা কঠিন। তবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। সামনে তা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ের সবাইকে এ বিষয়ে এখনই সতর্ক হতে হবে। শুধু উচ্চবিত্ত না, সব ধরনের প্রবীণদের জন্যই দেশব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটিতে খরচ বেশি—এ বিষয়ে সরদার এ নাঈম বলেন, পুরো বাসায় একজন বা দুজন মানুষের থাকা, কাজের মানুষ, গাড়ির চালকের বেতন, অন্যান্য খরচ—সব মিলিয়ে হিসাব করলে এখানকার খরচ আর বেশি মনে হবে না। আর এখানে প্রবীণেরা স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিসহ অবসরজীবনকে উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন।