সোমবার সকালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে ‘সত্তর দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: শিল্পরূপ ও সাংস্কৃতিক প্রভাব’ শীর্ষক একটি সেমিনার হয়েছে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঝুনা চৌধুরী ও মোস্তফা মনন। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক মো. নিজামুল কবীরের সভাপতিত্বে সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাইফুল ইসলাম, শিল্পসমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ, চলচ্চিত্র–গবেষক ও লেখক অনুপম হায়াৎ।

গবেষণার জন্য দুই গবেষক বেছে নিয়েছেন ১৯৭২ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’, ১৯৭৩ সালে আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ১৯৭৫ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘লাঠিয়াল’, ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়ন মণি’ ও আজিজুর রহমানের ১৯৭৮ সালের সিনেমা ‘অশিক্ষিত’। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই ছয় চলচ্চিত্রে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই প্রভাব ইতিবাচক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার নেতিবাচক।

গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন চলচ্চিত্রগুলোর বর্ণনাভঙ্গি, আলোচনা করেছেন চিত্রনাট্যের স্বরূপ, অনুসন্ধান করেছেন ছবিগুলোতে দেশের ও বিদেশের সংস্কৃতির প্রভাব কতটা। এ ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ছবিগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিচার করেছেন তাঁরা। দেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান যে চালচিত্র, তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোর প্রভাবক হিসেবে এই ছবিগুলোর ভূমিকাও তুলে ধরেছেন গবেষকেরা।

‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রে  সেই সময়ের অসাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি তুলে ধরা জরুরি ছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে নির্মিত ছবিটির ক্ষেত্রে নির্মাতার ওপর ছিল অনেক দায়। দুই গবেষকের মতে, ‘যে দৃষ্টিকোণ থেকে “অবুঝ মন” চলচ্চিত্রটি নির্মিত, সেটা আসলে সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি এবং আজকের দিনে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক যে চেতনা পরিলক্ষিত হচ্ছে, ধর্মীয় অস্থিরতার যে আভাস পাওয়া যায়, তার দায় ‘অবুঝ মন’ ও এই ধরনের চলচ্চিত্র প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কতটা নেবে, এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা প্রয়োজন।’

আরও অনেক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রকে প্রভাবিত করা ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবিটি প্রসঙ্গে গবেষকেরা বলেন, পরবর্তী সময়ে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহু চলচ্চিত্রে এর প্রভাব ছিল, এ ছাড়া ছিল সামাজিক প্রভাব। যুদ্ধের পরে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের ব্যাপারে ইতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রেখেছে ছবিটি।

বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া ছবি ‘লাঠিয়াল’। এ ছবি প্রসঙ্গে গবেষকেরা বলেছেন, এটি শতভাগ বাংলাদেশি ছবি, যেখানে গ্রামবাংলার যথার্থ চিত্রায়ণ দেখা যায়। সুন্দর স্বদেশি গল্পে গ্রামবাংলার যথাযথ উপস্থাপনে এই সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

আলোচনায় সাইফুল ইসলাম বলেন, যে চলচ্চিত্রের শিল্পরূপ যত নান্দনিক, দেখা গেছে সে চলচ্চিত্র সুধীজনের কাছে সমাদৃত হয়েছে। মইনুদ্দীন খালেদ বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাংলাদেশের আবহমানকালের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে সমকালের বাস্তবতাকে উপস্থাপন করে। এ দেশের চলচ্চিত্রে জনসংস্কৃতির যে প্রকাশ, তা বিশেষভাবে মূল্যায়ন হওয়ার প্রয়োজন আছে। অনুপম হায়াৎ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সত্তরের দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের চলচ্চিত্রে বিধৃত হয়েছে বাঙালির আশা–আকাঙ্ক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতি।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের পরিচালক মো. মোফাখখারুল ইকবাল। এ ছাড়া বক্তব্য দেন এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক সাংবাদিক রফিকুজ্জামান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্টামফোর্ডের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষক ও চলচ্চিত্র পরিচালক মতিন রহমান প্রমুখ।