মুন অ্যালার্ট: ২৩ ঘণ্টার মধ্যে মা–বাবার কোলে ফেরানো গেল মুসকানকে
জারা বারোকা মুসকানের বয়স মাত্র ৫ বছর। বাসার সামনে ৮ বছর বয়সী ভাই সাঈদসহ অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিল। শিশুদের সঙ্গে ১৯ বছর বয়সী আরিফ নামের একজনও ছিলেন। একসময় সাঈদ ও মুসকানের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ২৩ ঘণ্টা পর পল্লবী থানার পুলিশ, জনগণসহ সবার সহায়তায় মুসকানকে উদ্ধার করা হয়।
ঢাকার মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশন থেকে ১৪ জানুয়ারি বিকেল ৫টার দিকে নিখোঁজ হয়েছিল মুসকান ও তার ভাই। পরে মুসকানকে উদ্ধার করা হয় সদরঘাটের এক লঞ্চ থেকে। হারিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সহায়তায় ডিজিটাল বিলবোর্ড, ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় ছবিসহ মুসকানের হারিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মুসকানের বাবা মো. জুয়েল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিরপুর সেকশন ১২–তে আমার আর মুসকানের নানার বাসা পাশাপাশি। প্রথমে এসে খাতির জমায়, পরে পার্কে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আরিফ নামের ওই ছেলে আমার ছেলে–মেয়েকে নিয়ে যায়। ছেলে সাঈদকে মিরপুর ১২ নম্বর মেট্রো স্টেশনের কাছে গিয়ে একটি চিপস কিনতে পাঠায় আরিফ। এই ফাঁকে মেয়ে মুসকানকে নিয়ে চলে যায়। আমার ছেলে মানুষের সহায়তায় বাসায় ফিরে ঘটনা জানায়।’
আরিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কী কী করেছিলেন, তা সাঈদ জানানোর পর পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তখন তৎপর হয় থানার পুলিশও।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আলমগীর জাহান প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটি হারিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর সারা রাত ৬টি সড়ক থেকে ৩০–৩৫টি সিসি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। আরিফ নামের অপহরণকারী সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তাতে জানা যায়, তিনি ভবঘুরে। তবে একটি পোশাক কারখানায় তাঁর মা ও ভাই চাকরি করেন। সেই কারখানা থেকে মা ও ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডেকে আনা হয়। পরে আরিফের আত্মীয়স্বজন থানায় আসেন। শিশুটিকে ছেড়ে দিলে মা ও ভাইকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। তারপর শিশুটিকে সদরঘাটে রেখে আরিফ পালিয়ে যান।
মুন অ্যালার্টে উদ্ধার
১৩ জানুয়ারি নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে ‘ফ্রি হেল্পলাইন’ (১৩২১৯) চালু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ উদ্ধারকাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম জোরদার ও দ্রুত সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে জরুরি সতর্কতা–ব্যবস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন)।
মুসকান হারানোর পর মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে সতর্কতা–ব্যবস্থার মাধ্যমে মুন অ্যালার্টের ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন জায়গায় দ্রুত বার্তাটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মুসকানকে উদ্ধারের খবরও পেজটিতে দেওয়া হয়।
নিখোঁজ শিশুসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে টোল ফ্রি হেল্পলাইনটিতে জানানোর পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বর, সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের ০১৩২০০১৭০৬০ নম্বরেও জানানো যাবে। এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করে জরুরি সতর্কবার্তা মুন অ্যালার্ট জারি করছে সিআইডি।
মুসকানের বাবা জুয়েল মাহমুদ বলেন, তিনি ফেসবুক ও সায়েন্স ল্যাব মোড়ের ডিজিটাল বিলবোর্ডে মেয়ের হারানো বিজ্ঞপ্তিটি দেখেছেন। একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সদরঘাটের ১ নম্বর টার্মিনালের বড় স্ক্রিনে মুসকানের হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচার হতে দেখেছেন। প্রচারের ফলে মানুষের চোখে পড়েছে বিষয়টি।
পেশায় গাড়িচালক জুয়েল মাহমুদ জানান, তাঁর মুন অ্যালার্ট সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তবে তাঁর ছোট ভাই ও এক ভাগনি এ বিষয়ে জানান।
জুয়েল মাহমুদের ছোট ভাই এম ডি রাতুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুন অ্যালার্ট নামে একটি সতর্কবার্তা চালু হয়েছে, তা ফেসবুকে দেখে মুন অ্যালার্টের পেজটা ফলো দিয়ে রেখেছিলাম। মুসকানকে যখন পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন রাতে হেল্পলাইন নম্বরে ফোন দিলে তারা মুসকানের ছবিসহ তা শেয়ার করে। বিভিন্ন জায়গার ডিজিটাল বিলবোর্ডসহ বিভিন্নভাবে প্রচার হয়। পরে সদরঘাটের মানুষের সহায়তায় পুলিশ মুসকানকে দ্রুত উদ্ধার করে।’
মুসকানকে উদ্ধার ফিরিয়ে আনছে না–ফেরা মুনতাহার স্মৃতি
যদি মুন অ্যালার্ট–ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো মুনতাহা আক্তার জারিনকেও ফিরে পাওয়া যেত—এ আক্ষেপ শিশুটির চাচাতো ভাই মাহবুব হোসেনের। তিনি এখন মুন অ্যালার্টের কাজের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন।
২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাটে নিখোঁজ হয়েছিল ৫ বছর বয়সী মুনতাহা। ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিক, মায়াবী চোখে বেগুনি রঙের জামা গায়ে হাসিমুখের মুনতাহার ছবি ফেসবুকে সবার মন কেড়েছিল তখন। নিখোঁজের ৭ দিন পর মুনতাহার লাশ উদ্ধার হয়।
মুনতাহার বাবা শামীম আহমদ গত শনিবার প্রথম আলোকে জানান, মুনতাহাকে প্রাইভেট পড়াতেন পাশের বাসার শামীমা বেগম। ঘটনার ১৫ দিন আগে শামীমাকে বলা হয়েছিল, তিনি যেন মুনতাহাকে আর না পড়ান। সে কারণেই মুনতাহাকে হত্যা করা হয়। শামীমাকে আটকের পর ভোরে তাঁর মা আলিফজান ডোবা থেকে শিশু মুনতাহার লাশ নিয়ে পুকুরে ফেলতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন।
মেয়ে নিখোঁজের ঘটনায় জিডি করেছিলেন শামীম আহমদ। পরে তা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। বিচার এখনো চলছে।
মুনতাহার মতো শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অপহৃত শিশুদের উদ্ধারে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনের বিষয়টি তুলে ধরেছিল।
সিআইডির মুন অ্যালার্টের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে জরুরি সতর্কবার্তার ধারণাটি গুরুত্ব পায় ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শিশু অ্যাম্বার হ্যাগারম্যান অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ৩২টি দেশে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু হয়। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে নিজস্ব আইনগত ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকরভাবে অ্যাম্বার অ্যালার্টের আদলে এমন সতর্কবার্তার ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশে চালু হলো মুন অ্যালার্ট।
বাংলাদেশে মুন অ্যালার্টের মতো ব্যবস্থা চালুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলেন অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের আহ্বায়ক সাদাত রহমান। আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাদাত মুন অ্যালার্টের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জিরো মিসিং চিলড্রেন নামের একটি সংগঠন পরিচালনা করছেন।
সাদাত রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মুন অ্যালার্ট বাস্তবায়নে সিআইডি এগিয়ে এসেছে। মেটা কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংস্থার অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুন অ্যালার্টকে আরও কার্যকর করতে হবে। হারানো শিশুদের তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, বাবা–মায়েদের নিয়ে মুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান।
সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, মুন অ্যালার্ট চালু হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। এ ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছে সিআইডি ও এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের নেতৃত্বে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্মের কারিগরি ও সমন্বয় সহায়তার জন্য অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের সদস্যরা এ উদ্যোগে যুক্ত আছেন।
হারানো শিশুর তথ্য পাওয়ার পর যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডি জরুরি সতর্কবার্তা জারি করছে। এই সতর্কবার্তা অফিশিয়াল ওয়েব পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড, প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল এসএমএস/সেল ব্রডকাস্টিং এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যমে প্রচার করা হবে, যাতে সাধারণ জনগণ দ্রুত তথ্য দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।
তবে এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে এর সঙ্গে থানা–পুলিশকে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন পল্লবী থানার ওসি এ কে এম আলমগীর জাহান। তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন থানার ওসিরা এখন পর্যন্ত এটা সম্পর্কে সেভাবে জানেন না। কোনো শিশু হারিয়ে গেলে ভুক্তভোগী পরিবার প্রথমে সংশ্লিষ্ট থানায় যায়, তাই ওসিদের মুন অ্যালার্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা বেশি জরুরি।