default-image

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে বা কমছে। এ থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী কার্যকর কোনো উদ্যোগ স্বাস্থ্য বিভাগের বা অন্য কোনো বিভাগের নেই। এ নিয়ে অতীতে দেশি–বিদেশি বিশেষজ্ঞরা যেসব সুপারিশ করেছেন বা পরামর্শ দিয়েছেন, তার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়নি।’

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ উপেক্ষিত

২০১৭ সালে ঢাকা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ববিদ কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। সরকারের কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে কে কৃষ্ণমূর্তি ‘মিড–টার্ম প্ল্যান ফর কন্ট্রোলিং অ্যান্ড প্রিভেন্টিং এডিস–বর্ন ডেঙ্গু অ্যান্ড চিকুনগুনিয়া ইন বাংলাদেশ’ নামের ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করেন।

ওই দলিলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মূল্যায়ন করার পশাপাশি রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য–শিক্ষা–যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে ‘র‌্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করতে বলা হয়েছিল। ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে বলা হয়। ওই পরিকল্পনার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৯ সালের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল।

ওই বছরই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের জ্যেষ্ঠ কিটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল মশা বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। বি এন নাগপাল মশা নিয়ন্ত্রণ ও মানুষকে সচেতন করার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে জানতে চাইলে সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা শিবিরে আমরা মশা জরিপ করেছি।

এ ছাড়া ডেঙ্গু চিকিৎসার নির্দেশিকা তৈরি করে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, মশা নিধন না করতে পারলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কে কৃষ্ণমূর্তি এবং বি এন নাগপালের প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান।

আক্রান্তের সংখ্যা বেশি

ডেঙ্গুতে এ বছর কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে বা প্রতিবছর কত মানুষ আক্রান্ত হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যাই শুধু প্রকাশ করে। বাস্তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৫৬৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৪৫ জন। তালিকায় দেখা যায়, দেশের ৫০টি জেলায় হাসপাতালে এ বছর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ঢাকার পর বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে কক্সবাজার জেলার হাসপাতালে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরীক্ষাগারসহ মোট ১২টি সরকারি–বেসরকারি পরীক্ষাগারে গত সাড়ে তিন মাসে ৪ হাজার ২৯২ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে।

সরকারি হিসাবে, পুরো কক্সবাজার জেলায় চিকিৎসা নিতে যত ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তার চার গুণের বেশি রোগী টেকনাফ উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে।

কক্সবাজার জেলার সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর জেলায় ১৩ হাজার ৮৬৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত হয়েছে। এদের বড় অংশ রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা।

কক্সবাজারের পরিস্থিতি বোঝার জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একাধিক দল এ জেলা পরিদর্শন করেছে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগে, বিশেষ করে কক্সবাজার জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।

সেখানে এডিশ মশার ঘনত্ব বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে এই জেলায় পরীক্ষা করানোর সুযোগ–সুবিধা বেশি থাকার কারণে বেশি মানুষ পরীক্ষা করাচ্ছে, বেশি শনাক্ত হচ্ছে। দেশের সব জেলায় এমন সুযোগ থাকলে দেখা যেত রোগীর সংখ্যা আরও বেশি।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন