‘রাতের ভোটের’ আগে চালু করা গাড়ি ঋণ নিয়েছেন ২,৩৫৭ কর্মকর্তা
‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রশাসনকে একটি ‘বিশেষ উপহার’ দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেটি হলো সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের জন্য বিনা সুদে গাড়ি কেনার ঋণ।
তখন এ বিষয়ে একটি নীতিমালা জারি করে বলা হয়, কর্মকর্তারা বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন গাড়ি কেনার জন্য। নেওয়া হবে শুধু ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জ। ১২০টি মাসিক কিস্তিতে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। গাড়ির ঋণগ্রহীতারা বছরে ১০ শতাংশ হারে আট বছর অবচয়সুবিধা পাবেন।
গাড়ির ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কোনো কর্মকর্তা যদি আট বছর ১০ শতাংশ হারে অবচয়সুবিধা (ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি) পান, তাহলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয় ১৩ লাখ টাকার মতো। এতে মাসে কিস্তি আসে ১১ হাজার টাকার আশপাশে।
সরকার গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়। ব্যবহারকারীরা বলছেন, ঢাকায় চলাচল করলে একজন কর্মকর্তার গাড়ি ঋণের কিস্তি, চালকের বেতন ও জ্বালানি খরচ হয়ে যায় সরকারের দেওয়া রক্ষণাবেক্ষণের অর্থে।
গাড়ির ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কোনো কর্মকর্তা যদি আট বছর ১০ শতাংশ হারে অবচয়সুবিধা (ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি) পান, তাহলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয় ১৩ লাখ টাকার মতো। এতে মাসে কিস্তি আসে ১১ হাজার টাকার আশপাশে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২ হাজার ১৩৭ কর্মকর্তা (সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগ এই হিসাবের বাইরে) গাড়ি কিনতে বিনা সুদের ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভাতাসুবিধা নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার এই সুবিধা বহাল রেখেছিল। ২০২৪–২৫ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরের গত ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সুবিধা পেয়েছেন ২২৬ জন উপসচিব।
বিএনপি সরকার আসার পর, আগে সুবিধাটি না পাওয়া এবং নতুন পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা একের পর এক আবেদন নিয়ে হাজির হন। সূত্র বলছে, গত ১৭ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি—মাত্র ছয় কার্যদিবসে অন্তত ৬০ জন উপসচিবের গাড়ি ঋণ ও ভাতা অনুমোদন করা হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মূলত রাতের ভোট সফল করতে এবং আমলাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই অনৈতিক সুবিধা চালু করেছিল। নতুন সংসদ সদস্যরা যেহেতু শুরু থেকেই শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট না নেওয়ার মতো দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই আমলাতন্ত্রের এই বৈষম্যমূলক ও অনৈতিক ধারা চালু রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান
তিন আমলে সব মিলিয়ে সুবিধাটি দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৫৭ জনকে। বর্তমানে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তা রয়েছেন তিন হাজারের মতো।
বিএনপি সরকার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয়ের কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। ৫ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে জানানো হয়, সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার বিনা সুদের ঋণ বন্ধ থাকবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিনা সুদের গাড়ি ঋণকে ‘জনগণের অর্থের অপচয়’ এবং আমলাদের তোষামোদ করার জন্য একটি ‘অনৈতিক ও অযাচিত পুরস্কার’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মূলত রাতের ভোট সফল করতে এবং আমলাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই অনৈতিক সুবিধা চালু করেছিল। নতুন সংসদ সদস্যরা যেহেতু শুরু থেকেই শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট না নেওয়ার মতো দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই আমলাতন্ত্রের এই বৈষম্যমূলক ও অনৈতিক ধারা চালু রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এই সুবিধা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত কমিশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে, ওই তিন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে যে নির্বাচন একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রশাসনে জ্যেষ্ঠ সচিবের পদ তৈরি করা, পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) পদকে সচিবের ওপরে স্থান দেওয়া, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদকে প্রথম শ্রেণি ও উপপরিদর্শক (এসআই) পদকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা, সশস্ত্র বাহিনীর নন–কমিশনড পদকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা, বিনা সুদে গাড়িসুবিধা দেওয়া, বিপুলসংখ্যক পদোন্নতি দেওয়া ইত্যাদি সুবিধাকে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয়, প্রতে৵ক সদস্য তাঁদের অপকর্মের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বিপুলভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
বিনা সুদের ঋণে গাড়িসুবিধার নীতিমালা ২০১৭ সালে জারি হলেও তা দেওয়া হয় ২০১৮ সালে, অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর থেকে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে নির্বাচনে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়, ওই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগের রাতেই সারা দেশে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখা হয়েছিল। রাত ১০টা থেকে শুরু হয় সিল মারা, চলে রাত ৩টা পর্যন্ত।
নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন মূলত জেলা প্রশাসকেরা, যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয় উপসচিব পদ থেকে। সারা দেশে রাতে ভোট হয়ে গেলেও তাঁরা ব্যবস্থা নেননি, প্রতিবাদ জানাননি।
তিন নির্বাচন নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের সদস্য মো. আবদুল আলীম গত ১৪ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে যাতে কোনো দিক দিয়ে কথা না ওঠে, সে জন্য মুখ বন্ধ রাখতে নানা সুবিধা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করতে তারা জনগণের করের টাকা ব্যয় করেছে।
বিনা সুদের গাড়ি পেয়েও...
বিনা সুদে ঋণের গাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণের ভাতাসুবিধা পেয়েও বহু কর্মকর্তা চলাচল করেন সরকারি গাড়িতে। তাঁরা মূলত ব্যবহার করেন প্রকল্পের গাড়ি, যেগুলো প্রকল্প শেষের পর সরকারি পরিবহন পুলে দেওয়ার কথা। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু অবস্থা বদলায়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েক দফা প্রকল্পের গাড়ির হিসাবের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চিঠিও দেওয়া হয়; কিন্তু হিসাব আর প্রকাশিত হয়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারও বন্ধ হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রকল্পের গাড়ির হিসাব নেওয়া হবে বলে জানান। এরপর ১৮ নভেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি চিঠিতে জানায়, প্রকল্প শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে গাড়ির সংখ্যা ও অবস্থা সম্পর্কে জানাতে হবে। প্রকল্প শেষের ৬০ দিনের মধ্যে গাড়ি সরকারি পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছিলেন, মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো হিসাব দিয়েছে। উল্লেখ্য, সেই হিসাব প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায়নি।
কোনো কোনো কর্মকর্তা সরকারের কাছ থেকে দুটি গাড়ির সুবিধা পান। একটি বিনা সুদের ঋণ বাবদ, অন্যটি পদের বিপরীতে; যেটির চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় পুরোটাই সরকারের।
সরকারের ব্যয় কত
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গাড়ি কিনতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকার বেশি (বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের হিসাব ছাড়া)। ঋণের সুদে ভর্তুকি এবং অবচয়সুবিধা বাবদ সরকারের কত টাকা ব্যয় হয়, তার হিসাব স্পষ্টভাবে কখনোই প্রকাশিত হয়নি। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দিতে ২ হাজার ৩৫৭ কর্মকর্তার পেছনে ব্যয় হওয়ার কথা ১৪১ কোটি টাকার কিছু বেশি।
অবশ্য কোনো কোনো কর্মকর্তা তাঁর পদের বিপরীতে গাড়ির সুবিধা পান। সে ক্ষেত্রে তাঁকে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেওয়া হয় মাসে ২৫ হাজার টাকা। ফলে কোনো কোনো কর্মকর্তা সরকারের কাছ থেকে দুটি গাড়ির সুবিধা পান। একটি বিনা সুদের ঋণ বাবদ, অন্যটি পদের বিপরীতে; যেটির চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় পুরোটাই সরকারের।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরে নিয়োজিত প্রশাসন ক্যাডারের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা যখন বিনা সুদে গাড়ির ঋণসুবিধা নিয়েছিলেন, তখন তাঁদের পদায়িত কর্মস্থল থেকেই প্রাধিকার অনুযায়ী গাড়ি পেয়েছিলেন। সে জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে তাঁরা ২৫ হাজার টাকা করে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পেয়েছিলেন। তাঁরা আরও বলেন, যেহেতু তাঁরা সরকার থেকে আরেকটি গাড়ি পেয়েছিলেন, তাই ব্যক্তিগত গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাওয়া পুরো ২৫ হাজার টাকাই কিস্তি দিয়ে দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন সহযোগী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি সমপদমর্যাদার সবাইকে দিতে হবে, নইলে কাউকে নয়। উপসচিবেরা গাড়ি পাবেন; শিক্ষক, চিকিৎসকেরা বঞ্চিত হবেন কেন। এটি শুধু বৈষম্য নয়, এটি সামাজিক অবিচার ছিল।
বৈষম্য
২০১৮ সাল থেকে উপসচিব হলেই গাড়ি ঋণ পাওয়া যেত। ২০২০ সালের আগস্টে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নতুন নিয়ম করে যে উপসচিব পদে তিন বছর চাকরির পর বিনা সুদের গাড়ি ঋণের সুবিধা পাওয়া যাবে।
উপসচিব পদটিতে বেশির ভাগ থাকেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে গাড়িসুবিধা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। ২০১৯ সালে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাধিকারপ্রাপ্ত (একটি নির্দিষ্ট পদ থেকে) কর্মকর্তাদের এই সুবিধা দেওয়া শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের ‘ডামি ভোট’ নামে পরিচিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বিচার বিভাগকেও গাড়ি ঋণের সুবিধার আওতায় নিয়ে আসে। অন্যদের কখনোই তা দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে বিসিএস ক্যাডারের সংখ্যা ২৫টি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য বা কারিগরি ক্যাডারের কর্মকর্তারা এ সুবিধা পাননি। স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন সহযোগী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের গাড়ি সমপদমর্যাদার সবাইকে দিতে হবে, নইলে কাউকে নয়। উপসচিবেরা গাড়ি পাবেন; শিক্ষক, চিকিৎসকেরা বঞ্চিত হবেন কেন। এটি শুধু বৈষম্য নয়, এটি সামাজিক অবিচার ছিল।