যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকায় আসছেন এ মাসে

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুফাইল ছবি

ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক জোরদার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের পথরেখা নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। এই সফরে তিনি সরকারি ও বেসরকারি নানা পর্যায়ে কয়েকটি বৈঠক ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন।

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, ডোনাল্ড লু ১৪ মে দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফরের সময় পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি। দুই দিনের ঢাকা সফরের সময় ডোনাল্ড লুর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের কথা রয়েছে।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, ডোনাল্ড লু এ মাসের মাঝামাঝি ঢাকায় আসছেন।

গত ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড লুর ঢাকা সফরটি হতে যাচ্ছে উচ্চপর্যায়ের প্রথম সফর। যদিও গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এনএসসি) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল এইলিন লুবাখারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছিল। এইলিন লুবাখার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনেরও বিশেষ সহকারী। ওই সফরে ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তার নিরিখে ভূরাজনীতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মতপার্থক্যটা কারও অজানা নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে বিবেচনায় রেখে গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। এরপর থেকে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার কথা বলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পরও ভোট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হতাশা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ না করাটা হতাশাজনক।

এইলিন লুবাখারের সফরের প্রসঙ্গ টেনে এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউসের অধীন এনএসসি মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার পটভূমিকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে কাজ করে থাকে। আর ফেব্রুয়ারিতে এনএসসির পরিচালকের ঢাকা সফরের সময় মিয়ানমারের সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কতটা হুমকি তৈরি করে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। ফলে ওই সফরের সময় দুই দেশই সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও নিজেদের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর আলোচনায় জোর দেওয়া হয়।

ডোনাল্ড লুর সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন স্পষ্ট করেছেন। ওই চিঠির শুরুতে বাইডেন ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারত্বের পরবর্তী অধ্যায় শুরুর পর্ব’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন; যা থেকে স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে মনোযোগ দিচ্ছে। আর অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হিসেবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ডোনাল্ড লু ঢাকায় এলে এ বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্য কোন বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকার দেবে, সে ধারণা পাওয়া যাবে।

তবে সুশাসন, মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির অগ্রাধিকার কি আলোচনা থেকে হারিয়ে গেল? এমন প্রশ্নের জবাবে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়গুলো আলোচনা থেকে হারানোর সুযোগ নেই। সুশাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকারসহ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়গুলোকে সামনে রাখবে না। তবে এ বিষয়গুলো নিয়ে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ, দেশটি বৈশ্বিক মানদণ্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে থাকে। ফলে অন্য বিষয়গুলোকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে একটু পাশে সরিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে মনোযোগী যুক্তরাষ্ট্র।

আরেক কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পর্বে সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র শ্রম অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিতে জোর দিতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে এইলিন লুবাখারের ঢাকার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) সহকারী প্রশাসক মাইকেল শিফার শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। গত মাসে বাংলাদেশ সফরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন টিকফা ফোরামের বৈঠকের পাশাপাশি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বৈঠকে শ্রম পরিস্থিতির উন্নয়নের তাগিদ দিয়েছেন।

পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সামর্থ্য নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশন (ইউএসআইটিসি)।

গত বছরের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড লু ঢাকা সফরে এসেছিলেন। পরের কয়েক মাসে ঢাকায় অংশীদারত্ব, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ বছর দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ তিন ফোরাম অংশীদারত্ব, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংলাপ ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আবার এ বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এমন প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকগুলোর ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে ঢাকা সফরের সময় আলোচনা করতে পারেন ডোনাল্ড লু।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরের পাশাপাশি এখন ভারত মহাসাগরকে ঘিরেও পরিকল্পনা করছে। এ জন্য বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। ভারত মহাসাগরের ঠিক ওপরের দিকে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার বাংলাদেশে থাকলে এখানে তাদের একটা অবস্থান থাকল এমনটা মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য থাকার পরও এখন পর্যন্ত দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জোরালো মনোভাব দেখাচ্ছে। সেদিক থেকে আসন্ন সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ।