বিকল্প জ্বালানি উৎসে সাড়া অনেক, তবে বিলম্বের শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিকল্প উৎস থেকে তেল–গ্যাস আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। শুরুতে সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি মিলেছে খুব কম। একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির ক্ষেত্রেও। ফলে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।
বাংলাদেশে তেল–গ্যাস আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা বেশি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই দুই খাতেই বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়। তবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অন্য দেশগুলোও একই চেষ্টা চালানোয় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও ইরান জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাহাজ জ্বালানি নিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনায় একের পর এক হামলার কারণে কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে পড়েছে। সরবরাহ–শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়েই জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, যার চাপ পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৬৫ শতাংশ এবং এলপিজির ৫১ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আবার পরিশোধিত ডিজেলের বড় অংশ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এলেও সেসব দেশও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার প্রভাব বিকল্প উৎসেও পড়েছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে পড়েছে। সরবরাহ–শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়েই জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, যার চাপ পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন সরবরাহ ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ জন্য প্রচলিত উৎসের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও তেল ও গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে যেকোনোভাবে সরবরাহে ঘাটতি না পড়ে। অর্থাৎ বাজারমূল্য বাড়লেও জ্বালানি সংগ্রহ অব্যাহত রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার।
যদিও ইরান জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাহাজ জ্বালানি নিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনায় একের পর এক হামলার কারণে কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে দেশে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যয় বাড়লেও আপাতত ডিজেল, অকটেন কিংবা পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর না দিয়ে সরকার নিজেই তা বহন করার অবস্থান নিয়েছে।
এ অবস্থান ধরে রাখতে সরকার বিকল্প অর্থায়নের পথও খুঁজছে। বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, যত দিন পর্যন্ত আর্থিক চাপ নেওয়া সম্ভব হবে, তত দিন পর্যন্ত জ্বালানির দাম না বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে।
জ্বালানি তেলে নিশ্চয়তা মিলেছে দুটিতে
দেশে জ্বালানি তেল আমদানির একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সাধারণত সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। তবে বর্তমান অস্থিরতায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবার সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তেল আনার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এ জন্য বিভিন্ন দেশের অন্তত ১১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তেল নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যকারী প্রতিষ্ঠান এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনা হবে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ব্যারেলে ৩ ডলার ছাড় দেবে। পাশাপাশি হংকংভিত্তিক সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড সরবরাহ করবে ২ লাখ টন ডিজেল। তারা প্ল্যাটসের দামের তুলনায় প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪০ ডলার পর্যন্ত ছাড় দিতে পারে।
উল্লেখ্য, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার মূলত দুটি কেন্দ্র ঘিরে পরিচালিত হয়—সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্র। বিপিসি সাধারণত আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসের সূচক অনুসরণ করে জ্বালানি কিনে থাকে। তেল জাহাজে তোলার দিনকে কেন্দ্র করে আগের দুই দিন, ওই দিন এবং পরের দুই দিনের দর গড় করে প্রতি ব্যারেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
বিপিসি সূত্র জানায়, এ ছাড়া দুবাইভিত্তিক পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাসকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কাজাখস্তান থেকে ২ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতি ব্যারেলের দাম পড়বে ৭৫ দশমিক ১৭ ডলার, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় কম। তবে বিপিসি এখনো এই চালান পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যকারী প্রতিষ্ঠান এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনা হবে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ব্যারেলে ৩ ডলার ছাড় দেবে। পাশাপাশি হংকংভিত্তিক সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড সরবরাহ করবে ২ লাখ টন ডিজেল। তারা প্ল্যাটসের দামের তুলনায় প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪০ ডলার পর্যন্ত ছাড় দিতে পারে।
অন্যদিকে পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল ১ লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহ করবে। প্রতিষ্ঠানটি প্ল্যাটসের সূচকের তুলনায় প্রতি ব্যারেলে ৩ ডলার ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রকৌশল ও জ্বালানি অবকাঠামো সেবাদাতা বিজেএন গ্রুপ ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা প্রতি ব্যারেলের দাম প্রস্তাব করেছে ৭৯ দশমিক ০৯ ডলার। দুবাইভিত্তিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান আইএল টেক ভেনচারস ৩০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করতে চায়। তাদের প্রস্তাবিত প্রতি ব্যারেলের দাম ১৯৪ দশমিক ৫৮ ডলার। আর ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি প্রতি দুই সপ্তাহে ১ লাখ টন করে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে আছে প্রতি টনে ১৫ ডলার ছাড় পাওয়ার কথা।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, তালিকায় থাকা আরও চারটি প্রতিষ্ঠান এখনো চূড়ান্ত দর প্রস্তাব দেয়নি। তাদের কাছ থেকেও প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। পরে সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিপিসির দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগ্রহ অনেক প্রতিষ্ঠানই দেখাচ্ছে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা কম। অনেকেই এখনো সুনির্দিষ্ট সরবরাহ সূচি জানাতে পারেনি। ফলে বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি সরবরাহ পরিকল্পনাও বারবার সমন্বয় করতে হচ্ছে।
এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটেও দেশে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তেল সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করার ক্ষেত্রে অতীতের সেই অভিজ্ঞতা এবারও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলছে।
এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্চে কিছু এলপিজি আমদানি হয়েছে বটে, তবে এপ্রিলে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
এপ্রিলে এলপিজি আমদানি নিয়ে শঙ্কা
দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। এর ৯৯ শতাংশই সরবরাহ করে বেসরকারি খাত। উদ্যোক্তারা বলছেন, জাহাজভাড়া অস্বাভাবিক বাড়ায় এলপিজি আমদানিতে এখন বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এলপিজির ৭৫ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি আমদানির হার ছিল ৫১ শতাংশ। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এখন আমদানি কার্যত বন্ধ।
এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্চে কিছু এলপিজি আমদানি হয়েছে বটে, তবে এপ্রিলে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ মাসে কমিশন টনপ্রতি ১২০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে দাম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে এখন জাহাজভাড়া অনেক বেশি। ফলে বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোক্তা আমদানি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। কারণ, উচ্চ প্রিমিয়ামে এলপিজি আনলেও যদি দাম না বাড়ে, তাহলে লোকসান গুনতে হবে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের পর অপারেটররা বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার চেষ্টা করছেন। গুটিকয় জাহাজে এলপিজি এসেছে। সরকারি সংস্থা বিপিসিও আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল। এখন সংকটের এই সময়ে তাদের আরও জোর চেষ্টা থাকা উচিত।
তবে বিপিসি বলছে, গত জানুয়ারিতে বাজারে অস্থিরতার সময় তারা এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিলেও এখনো কোনো সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি। এমনকি দরদামও চূড়ান্ত হয়নি। এলপিজি আমদানির জন্য ৮টি দেশের ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ দেশই সাড়া দেয়নি। ওমান ও ইন্দোনেশিয়া আগ্রহ দেখালেও তাদের প্রস্তাবিত দর বিপিসির প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বেশি ছিল।
বিপিসির অভ্যন্তরীণ হিসাবে প্রতি মেট্রিক টনে প্রিমিয়াম বা জাহাজভাড়া ধরা হয়েছিল প্রায় ১০৫ ডলার। কিন্তু প্রথম দফার দরপত্রে প্রিমিয়ামের প্রস্তাব আসে ১৬৫ ডলার। দ্বিতীয় দফায় কাতার প্রস্তাব করে ১৯০ ডলার এবং মালয়েশিয়া ১৫০ ডলার।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা মালয়েশিয়া—কোনো দেশের সঙ্গেই এখন পর্যন্ত এলপিজি আমদানির চুক্তি হয়নি। আবার নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে।
চলতি মাসে আটটি এলএনজিবাহী জাহাজ এসেছে। আগামী মাসে মোট নয়টি জাহাজ আসবে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে। ফলে এপ্রিল পর্যন্ত বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে না বলেই আশা করা হচ্ছে।পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক
এপ্রিলে এলএনজি আনবে ৯ জাহাজ
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা যায় ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। মোট সরবরাহের মধ্যে ৯০ থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট আসে এলএনজি থেকে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির পর তা কমে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি কার্গো আসার কথা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। এর ৪০টি সরবরাহ করার কথা কাতারের। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার কারণে কাতারে এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একইভাবে ওমান থেকেও নিশ্চিত বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশকে এখন বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এলএনজি আমদানি করে। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, সাধারণ সময়ে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১১টি এলএনজিবাহী জাহাজ আসে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই সংখ্যা কমে গেছে। একই সঙ্গে দামও বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০ থেকে ১১ ডলার। এখন তা বেড়ে প্রায় ২২ ডলারে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, চলতি মাসে আটটি এলএনজিবাহী জাহাজ এসেছে। আগামী মাসে মোট নয়টি জাহাজ আসবে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে। ফলে এপ্রিল পর্যন্ত বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে না বলেই আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চলছে। সম্ভাব্য উৎস হিসেবে অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিকল্প উৎসে যোগাযোগ বাড়ানো হলেও তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেল–গ্যাসের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই অব্যবস্থাপনা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এই নাজুক অবস্থা মোকাবিলায় সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
এম শামসুল আলম আরও বলেন, ‘বিকল্প উৎস হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠান জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব দিচ্ছে, তাদের সক্ষমতা ও মান যাচাই করেই চুক্তি করা উচিত। তবে কম দামে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ থাকলে তা অবশ্যই লুফে নিতে হবে। যদিও আমরা দেখেছি, ২০২২ সালেও এমন প্রস্তাব এলেও নিজস্ব সক্ষমতার অভাবে অনেক দেশ থেকে শেষ পর্যন্ত তেল আনা সম্ভব হয়নি। তাই এবার আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’