পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যা
অভিযোগপত্র জমা ৫ দিনেই
১৯ মে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার।
একই দিন ২ আসামি আটক।
২০ মে থানায় মামলা।
একই দিনে আসামির স্বীকারোক্তি।
বিচার শেষ ৫-৭ দিনেই—আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর।
রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে আট বছরের শিশুকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। আদালত আগামী ১ জুন মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরুর দিন ধার্য করেছেন।
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত গতকাল রোববার বিকেলে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে এ আদেশ দেন। এর ফলে মামলা হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দিল পুলিশ। দেশে স্মরণকালে এত দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্য কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নজির পাওয়া যায় না।
গতকাল দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রীকে অভিযুক্ত করে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য বদলির আদেশ দেন। পরে মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে যায়। এরপর ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে ১ জুন অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন রেখে আদেশ দেন। পরে বিকেলে দুজনকে আবার কারাগারে নেওয়া হয়।
১৯ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ওই ফ্ল্যাটের শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে ওই বাসা থেকে তাঁর স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। আর ওই দিনই সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পরদিন শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। ২০ মে বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে জবানবন্দি দেন আসামি সোহেল রানা। জবানবন্দিতে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি।
২১ মে রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। দ্রুত এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এ আশ্বাসের পর মামলার দিন থেকে চার দিনের মাথায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। আর শিশু ও অভিযুক্ত ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার করে তিন দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট থেকে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে রাজধানীর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
বিচারকাজ দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (সরকারি কৌঁসুলি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মামলাটি পরিচালনা করবেন তিনি। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে আসামিপক্ষকে কোনো আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি।
এমন পরিস্থিতিতে অভিযোগপত্র গঠনের পর গতকাল সন্ধ্যায় আসামিপক্ষের হয়ে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী হিসেবে মুসা কালিমূল্যাহকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং দল ও সংগঠন ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে তারা। কম সময়ের মধ্যে অন্য যেসব মামলার অভিযোগপত্র জমা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম মাগুরার আলোচিত শিশুধর্ষণ ও হত্যা মামলা। গত বছরের ৬ মার্চের এ ঘটনার তদন্ত শেষে ৩৭ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। আর রায় ঘোষণা করা হয় ঘটনার ৭৩ দিনের মাথায়।
মাগুরা হত্যাকাণ্ডের আগে নারী-শিশু নির্যাতন, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছিল না। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনা হয়, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত এবং বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়। ২০২৫ সালে আনা এই সংশোধনী বর্তমান নির্বাচিত সরকার অনুমোদন করেছে।
৫–৭ দিনে শেষ হবে বিচার—আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যার ঘটনায় করা মামলার বিচারকাজ খুব সম্ভবত পাঁচ–সাত দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার, সরকার তা–ই করবে।
গতকাল সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিকে সাত ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এক দিনের মধ্যে। সেই ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সহযোগী হিসেবে তাঁর স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছে। সেই পরীক্ষায় তিন দিন সময় লাগে। তিন দিনের মধ্যে সেটা শেষ হয়েছে। প্রতিবেদন শনিবার বিকেলে জমা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চলে এসেছে। এগুলো সব একসঙ্গে করে অভিযোগপত্র প্রণয়নের কাজ শনিবার রাতের মধ্যে শেষ হয়েছে।
এসব ধর্ষণের ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক মূল্যবোধের অভাব থেকে হচ্ছে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এখানে সমাজ সংস্কার দরকার। সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরা দরকার ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে, সংস্কৃতির ভিত্তিতে। কিন্তু কিছু কিছু অপসংস্কৃতির আসর সমাজে পড়েছে। এই অপসংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের মাত্রা সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের কাজ হচ্ছে আইনানুগ ব্যবস্থা ও বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতেও তাঁরা এ ধরনের যেকোনো ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত বা অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেবেন না।