২০২৪ সালের ‘বর্ষা বিপ্লব’–এর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে নির্বাচন সামনে রেখে নারী, মেয়ে ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বাড়ছে, যা মানবাধিকার রক্ষায় দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা প্রকাশ করছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচে (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠনটির ওয়েবসাইটে ১৪ জানুয়ারি এটি প্রকাশিত হয়। এটি লিখেছেন এইচআরডব্লিউর নারী অধিকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক শুভিজৎ সাহা।
প্রতিবেদনে পুলিশের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এ জন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপ ও বক্তৃতা–বিবৃতি বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, এই গোষ্ঠীগুলো নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও সমাজে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করতে চাইছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের লিঙ্গসমতা ও নারীর অধিকার উন্নয়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তারা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ‘ইসলামবিরোধী’ কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানায়। এর পর থেকে নারীরা ও মেয়েরা মৌখিক, শারীরিক ও ডিজিটাল পরিসরে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন। সহিংসতার ভয় মতপ্রকাশের ক্ষমতা প্রয়োগের পরিবর্তে তাঁদের আরও নীরব করে তুলেছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। উল্লেখ করা হয়, গত ডিসেম্বরে ২৭ বছর বয়সী পোশাককর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি গোষ্ঠীর পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো হিন্দুদের বিরুদ্ধে অন্তত ৫১টি সহিংসতার ঘটনার তথ্য জানিয়েছে। এর মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত নির্যাতনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে আগে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে ছিল অনেক নারীর অংশগ্রহণ। তারপরও বাংলাদেশে নারীরা এখনো রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত।
আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টির কোনো নারী প্রার্থী না থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি জামায়াতে ইসলামী। ইসলামপন্থী এই দল যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, তার কোনোটিতে নারী প্রার্থী দেয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের উচিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বিবেচনা করা। এই সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা। রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) পালনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলা। সরকারকে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার সাংবিধানিক বিধানও রক্ষা করতে হবে।
এগুলো কোনো নতুন প্রস্তাব নয় মন্তব্য করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বর্ষা বিপ্লব’–এর আগে ও পরে বাংলাদেশিরা এগুলোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারসহ সব রাজনৈতিক দলকে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত।