জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বছরে ব্যয় দেড় লাখ কোটি টাকা

‘জ্বালানির জন-মালিকানা: বাংলাদেশের ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে আলোচকেরা। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হল মিলনায়তন, জাতীয় প্রেসক্লাব। ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৯৭ শতাংশই পূরণ হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। এই জীবাশ্ম জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বছরে এতে ব্যয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশে ৫০-৩০০ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের উৎস রয়েছে। বায়োগ্যাসসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে তেমনভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

আজ সোমবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হল মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে একশনএইড বাংলাদেশ ও জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) যৌথভাবে ‘জ্বালানির জন-মালিকানা: বাংলাদেশের ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর’ শিরোনামে একটি নাগরিক ইশতেহার উপস্থাপন করে।

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের সঞ্চালনায় জেটনেট-বিডির সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ এ ১৪ দফা নাগরিক ইশতেহার পাঠ করেন।

ইশতেহারে বলা হয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) স্বাধীন, সক্ষম ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এসআরইডিএ) দক্ষতা ও সামর্থ্য বাড়াতে হবে। ইশতেহারে ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্য কার্বন নির্গমন (নেট-জিরো কার্বন ইমিশন) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পে ২০৪০ সালের মধ্যেই এ লক্ষ্য অর্জন জরুরি বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের তালিকা তৈরি এবং এসব পণ্যের আমদানিতে আগামী পাঁচ বছর শূন্য কর রাখার কথা বলা হয়েছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আলোকে প্রযুক্তি হস্তান্তরে আন্তর্জাতিক দর–কষাকষিতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।

নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হাতে এই ইশতেহার তুলে দেওয়া হবে বলে জানান আয়োজকেরা। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। জ্বালানি মহাপরিকল্পনা তৈরিতে দেশের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিদেশিদের দিয়ে তৈরি এ মহাপরিকল্পনা প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এ ধরনের পরিকল্পনা তৈরিতে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও ভোক্তাদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে না দেওয়ার পক্ষে মত দেন আলোচকেরা।

সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও শক্তিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি অংশগ্রহণ অবশ্যই দরকার। বড় প্রকল্প যেমন ২০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াটের যে সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট, এগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি জমিতেই করতে হবে। এটা করার পরে এটার সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে বেসরকারি খাতে তখন আরও সুযোগ তৈরি হবে।’

এ সময় অধ্যাপক ম. তামিম মানুষকে ‘জ্বালানি দুর্ভিক্ষের’ মধ্যে ফেলে দিয়ে এখনই জীবাশ্ম জ্বালানি পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাবে না বলে মত দেন।

জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এবং চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী জাকির হোসেন খান বলেন, ‘আমরা অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কারণ, প্রধান উপদেষ্টার “তিন শূন্য” তত্ত্বের একটি শূন্য কার্বনতত্ত্ব। কিন্তু আমরা যখন বাস্তবে কাজ করতে দেখলাম, তখন দেখলাম উল্টো চিত্র।’

জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা দেখলাম বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত বিভিন্ন নবায়নযোগ্য চুক্তিগুলো, সেগুলোর ৩২টা চুক্তি কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়াই এবং কেস বাই কেস রিভিউ (পর্যালোচনা) ছাড়াই একতরফাভাবে বাতিল করা হলো। এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে বর্তমান অবস্থা, সেটা ৩ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। যেটা এই সরকারের আমলে কমপক্ষে ১০ শতাংশে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ আমরা উল্টো পথে রথযাত্রা শুরু করলাম।’

জাকির হোসেন তাঁর বক্তব্যে সরকারকে নির্বাচনের আগেই আদানির সঙ্গের বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিল করতে বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্য দেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জ্বালানি আমদানি করে আমাদের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছি। এই চাপ কমানোর একমাত্র উপায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আগামী ২০৩৫ সাল পর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক নতুন কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন নেই।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএসআরইএর সভাপতি ব্যবসায়ী মোস্তফা আল মাহমুদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক খসরু মোহাম্মদ সেলিম এবং জেটনেট-বিডির সদস্য সংগঠন নেকমের প্রধান নির্বাহী মনজুরুল হান্নান খান।