ঈদে বাড়ি ফেরা কী, জানে না ওরা
শেষ বিকেলে পর্দাঘেরা বারান্দায় খেলছিল জেরিন, মিম, হালিমারা। ভিন্ন ভিন্ন বয়সী এই শিশু-কিশোরীরা না সহপাঠী, না একই এলাকার কেউ। একেকজন একেক শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু তারা একত্র হয়েছে একই বেদনার সূত্রে। এ বেদনাই তাদের করেছে আপনজন। ঈদ, পরিবার, বাড়িফেরা, এসব শব্দের সঙ্গে তাদের তেমন পরিচয় নেই। কারণ, তাদের ফেরার কোনো জায়গা নেই। ঈদে, উৎসবে, পালাপার্বণে তাদের ভরসা এতিমখানার আশ্রয়টুকু।
তেজগাঁও রেললাইনের সঙ্গে সরু গলি দিয়ে একটু ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, বেশ কিছু একই আকৃতির ভবন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। আরও কিছুটা ভেতরে ঢুকলে আরেকটি ভবন। ভেতর থেকে শোনা যায়, শিশু-কিশোরীদের হইচই, উল্লাস। প্রথম তলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতিটি তলায় দেখা গেল শিশুদের ছোটাছুটি। বেদনা চেপে আনন্দমুখে ছুটে বেড়ানো এসব শিশু অনেকেই মনে করতে পারে না মা-বাবার মুখ। পরিবার বলতে কী বোঝায়, তা-ও বোঝার সুযোগ হয়নি ওদের।
মিম আক্তারের বয়স ১৩ বছর। পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। তার বাবা, মা আছে। বাবার বসবাসের স্থায়ী জায়গা নেই, তাই মিমের জায়গা ১২ মাস এখানেই। একসময় মিম মায়ের সঙ্গে থাকত। তবে মা তাকে ফেলে গেছে। এর পর থেকে তার ঠিকানা এই এতিমখানা।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান রহমতে আলম ইসলাম মিশন এতিমখানার বাসিন্দা ওরা। ঈদে ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেলেও তারা থেকে যায় এখানেই। মেয়েশিশু ও কিশোরী আছে প্রায় ৫০০। ছেলেশিশু-কিশোরদের স্থান অন্য ভবনে। মেয়েদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কারও মা-বাবা নেই, কারও হয়তো বাবা অথবা মা আছেন; কিন্তু যাওয়ার সুযোগ নেই।
মিম আক্তারের বয়স ১৩ বছর। পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। তার বাবা, মা আছে। বাবার বসবাসের স্থায়ী জায়গা নেই, তাই মিমের জায়গা ১২ মাস এখানেই। একসময় মিম মায়ের সঙ্গে থাকত। তবে মা তাকে ফেলে গেছে। এর পর থেকে তার ঠিকানা এই এতিমখানা।
১৮ বছরের জেরিন সুলতানা পড়ে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে। তার মা-বাবা থাকলেও সে দুই বোন শিউলি জান্নাত ও জান্নাতুল মাওয়াকে নিয়ে এখানেই থাকে। কারণ, মা-বাবার অবস্থা নেই তিন মেয়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার। ঈদের সময় মেয়েদের বাড়িতে নিতে যে খরচ, তা-ও নেই মা-বাবার। তাই তাদের তিন বোনের এখানেই থেকে যেতে হয়েছে। জেরিন বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া সরকারি সহায়তা আর সমাজের বিত্তবানদের দেওয়া অর্থেই চলে এই মেয়েদের ভরণপোষণ। খাদিজা জানালেন, মা-বাবা কেউ নেই এমন মেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন কেউ কেউ। তাদের ঈদে বাড়িতে নিয়ে যান অনেকে
মোবাশ্বিরা আক্তারের বয়স মাত্র ৭ বছর। সে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বাবা নেই, মা আছে। কিন্তু মায়ের নিজেরই থাকার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। তাই ঈদের সময়ও মাকে ছাড়াই ঈদ করতে হয় এতিমখানার এই চারদেয়ালের মাঝে। মোবাশ্বিরা জানায়, সে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়।
এখানকার আরেক বাসিন্দা হালিমা আক্তারের বয়স ১৪ বছর। সে নবম শ্রেণিতে পড়ে। মা-বাবা থাকলেও তাদের কোনো থাকার জায়গা নেই। তাই এতিমখানাতেই কাটে তার ঈদ। শেষ কবে মায়ের হাতে ঈদের সেমাই খেয়েছে মনে পড়ে না তার।
কথা হলো এতিমখানার হল সুপার খাদিজা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বললেন, জীবনের এত কষ্টের মধ্যেও এই এতিমখানায় থেকে, পড়াশোনা করে অনেকে স্বনির্ভর হয়েছেন। কেউ কেউ এখন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কেউ হয়েছেন চিকিৎসক। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য আছেন বিদেশেও। তাঁরা অনেক সময় দেখতে আসেন ওদের। উপহার পাঠান উৎসবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া সরকারি সহায়তা আর সমাজের বিত্তবানদের দেওয়া অর্থেই চলে এই মেয়েদের ভরণপোষণ। খাদিজা জানালেন, মা-বাবা কেউ নেই এমন মেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন কেউ কেউ। তাদের ঈদে বাড়িতে নিয়ে যান অনেকে।
পাশ থেকে খাদিজা খাতুন বলে উঠলেন, ‘ওদের ঘোরার খুব শখ, কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। মা-বাবা ছাড়া ওদের কোথায় ছাড়ব, কে দায়িত্ব নেবে?’ খাদিজা খাতুন নিজেও পড়াশোনা করেছেন এখানেই।
এতিমখানার অফিস সহকারী আনিসুর রহমান জানান, ঈদুল আজহায় বিত্তবানেরা অনেকেই এই এতিমখানায় কোরবানি দেন। এতে ঈদে খাবারের অভাব হয় না তাদের।
ফিরে আসার আগে এসব শিশুর কাছে জানতে চাইলাম উৎসবে, ঈদে, ছুটির সময়ে কেমন লাগে তাদের? বলল, ঈদের দিন ভালো খাবার খেতে পায়। এবার রোজার ঈদে জামার কাপড়ও পেয়েছে। কিন্তু টাকার অভাবে বানাতে পারেনি অনেকেই। ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করে কি না—জানতে চাইলে একস্বরে সবাই বলে, ‘খুব ইচ্ছা করে।’
পাশ থেকে খাদিজা খাতুন বলে উঠলেন, ‘ওদের ঘোরার খুব শখ, কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। মা-বাবা ছাড়া ওদের কোথায় ছাড়ব, কে দায়িত্ব নেবে?’ খাদিজা খাতুন নিজেও পড়াশোনা করেছেন এখানেই।
চেনা সমাজের ভেতরে থেকেও শিশুরা যেন বিচ্ছিন্ন এক জগতের বাসিন্দা। তাদের চোখজোড়া যেন একই সঙ্গে কৌতূহল, সংকোচ আর না-পাওয়ার গল্প বলে।