সড়ক–নদীর পাশে বর্জ্যের স্তূপ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মানুষ

বাসাবাড়ি ও বাজারের ময়লা–আবর্জনা ফেলা হচ্ছে আবাসিক ও ব্যস্ততম এলাকায়। সম্প্রতি গাজীপুর নগরীর গাছা রোড এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় ভাষাশহীদ রফিক সেতুসংলগ্ন এলাকায় থাকেন আল আমিন। এই সেতুর অদূরে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে ফেলা হচ্ছে নানা বর্জ্য। এতে এ এলাকা দিয়ে চলাচলকারী আল আমিনের মতো অনেকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

আল আমিন বলেন, পিকআপে, ময়লার ভ্যানে করে ময়লা এনে এখানে ফেলা হয়। বাতাস এলে গন্ধ ছড়ায়। তাঁরা ভোগান্তিতে পড়েন।

সাভারের আমিনবাজার এলাকায় থাকেন মাহমুদুল হাসান। চাকরি করেন ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে। বন্ধের দিন ছাড়া প্রতিদিনই হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজারের ময়লার ভাগাড়ের অংশের পাশ দিয়ে তাঁকে যেতে হয়। মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, গরমে ময়লা থেকে ধুলা উড়ে আসে আর বৃষ্টি হলে ময়লার দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। এতে সর্দি–কাশি লেগেই থাকে।

গাজীপুর ও কোনাবাড়ী অঞ্চলের বাসাবাড়ির সব ময়লা–আবর্জনা ফেলা হয় কড্ডা ও বাইমাইল এলাকায়। ফলে কড্ডা ও বাইমাইল এলাকার বাসিন্দারা বেশ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কড্ডার ব্যবসায়ী লিটন মিয়া বলেন, ময়লা জমতে জমতে এখানে পাহাড়সমান উঁচু হয়ে গেছে। ময়লার কারণে তাঁদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।

মোটকথা সাভারের বংশী ও ধলেশ্বরী নদীর পাড়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দুই পাশ ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থান এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলায় দূষিত হচ্ছে পানি ও মাটি। সেই সঙ্গে বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া বাতাস দূষিত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলছে।

নদীর পাড়ে বর্জ্যের স্তূপ

গত ১৯ এপ্রিল দেখা যায়, সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় ভাষাশহীদ রফিক সেতুর অদূরে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের কিছু অংশে ফেলা হচ্ছে নানা বর্জ্য। কোথাও কোথাও এসব বর্জ্যের স্তূপ ৪ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে আছে। এ ছাড়া নদীর জায়গায় বর্জ্য ফেলায় কিছু অংশ ভরাট হয়ে গেছে। বর্জ্য ফেলার পর কিছু স্থানে আগুন দিয়ে বর্জ্য ‍পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সাভার মডেল থানার অদূরে ধলেশ্বরী ও বংশী নদীর সংযোগস্থলের পাশেই নদীর পাড়ে প্রতিনিয়ত ময়লা ফেলা হচ্ছে। বিভিন্ন বাসা, বাড়িসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সেখানে ফেলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। ভাগলপুরের বাসিন্দা বৈদ্যনাথ সাহা বলেন, ‘আগে নদীর পাড়ে বিকেলে হাঁটতে যেতাম। এখন দুর্গন্ধে সেদিকে যাওয়া যায় না।’

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য

সাভারের নবীনগর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়কের উভয় পাশে অন্তত ১২টি স্থানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া আমিনবাজার এলাকায় রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ময়লার ভাগাড়। পাশেই বলিয়ারপুর পৌরসভার জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। আমিনবাজার থেকে বলিয়ারপুরে বর্জ্যের দূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ এলাকায় দুর্গন্ধে চলাচলকারীরা পথ চলেন অনেকটা নাক-মুখ বন্ধ করেই। অভিযোগ রয়েছে, বর্জ্য পোড়ানোর সময় আগুনে সৃষ্ট ধোঁয়ায় সড়কে চলাচলকারী পরিবহনচালক ও যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ময়লায় লাগানো আগুনের ধোঁয়া বাসে ঢুকে যায়।

প্রতিদিন সাভার পৌরসভায় উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৩১০ টন

সাভার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শুধু পৌরসভা এলাকায় ২০-৩০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। শিল্পকারখানা ও মানুষের বসবাসের কারণে পৌর এলাকায় প্রতিদিন ৩১০ টনের মতো বর্জ্য উৎপাদন হয়। ৯টি ওয়ার্ডের জন্য ৮৯টি ভ্যান দিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে ৩০০ জন কাজ করেন।

তাঁরা বলেন, পৌরসভার সামনের দিকের একটি স্থানে প্রাথমিক ডাম্পিং ইয়ার্ডে প্রথম সংগৃহীত বর্জ্য রাখা হয়। পরে সেগুলো পৌরসভার ট্রাকে করে বলিয়ারপুরে নির্দিষ্ট খাসজমিতে ফেলা হচ্ছে।

সাভার পৌরসভার প্রশাসক ও ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্জ্য অপসারণে যে পরিমাণ লজিস্টিক সাপোর্ট ও পরিবহনসুবিধা থাকা প্রয়োজন, তা নেই। বলিয়ারপুরে যেখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, সেখানে হয়তো দেড়-দুই বছর বর্জ্য ফেলা যাবে। পরে নতুন ডাম্পিং ইয়ার্ডের প্রয়োজন হবে। এ সময়ের মধ্যে যদি আমরা আধুনিক কোনো প্রযুক্তি বা আধুনিক কোনো ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করতে পারি, তাহলে ময়লাগুলো ধ্বংস বা রিসাইকেল করা হবে। এ রকম হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।’

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পৌরসভার বার্ষিক বাজেট ৩৫ কোটি টাকা। এটি সাভার পৌরসভার রাজস্ব বাজেট। এ বাজেটের প্রায় সব অংশই খরচ হয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। সড়কের পাশে, নদীর পাড়ে রাতের আঁধারে অনেকে বর্জ্য ফেলেন। আমরা সেটি বন্ধ করতে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করেছি।’

সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। গত ১৯ এপ্রিল তোলা
প্রথম আলো

ডিএনসিসির ময়লার ভাগাড় নিয়ে দুশ্চিন্তা

চলতি বছরের শুরুর দিকে ডিএনসিসির ময়লার ভাগাড় পরিদর্শন করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও বাস্তবায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। পরিদর্শন শেষে ভাগাড়ের বিষয়ে তাঁদের প্রতিবেদনে কিছু পর্যবেক্ষণ ও মতামত তুলে ধরা হয়েছে।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের মাধ্যমে জমির ওপর চাপ কমানো। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিরাপদে নির্দিষ্ট স্থানে অপসারণ, বর্জ্য থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাস করা ও বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কারণে ওই প্রকল্প এলাকায় ‘ওয়েস্ট ইনসিনারেশন পাওয়ার প্ল্যান্ট’ নির্মাণের কথা ছিল। প্রকল্প পরিচালক জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের সাইট ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেলেও পরিবেশের ছাড়পত্র না পাওয়ায় ওয়েস্ট ইনসিনারেশন পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণকাজ স্থগিত রয়েছে। ওই প্ল্যান্ট নির্মাণের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সঠিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যদি এই প্ল্যান্ট নির্মাণ না করা হয়, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। প্রকল্প এলাকায় প্রবেশপথে বিক্ষিপ্তভাবে ময়লা–আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া সাভার পৌরসভার বর্জ্যও প্রকল্প এলাকার আশপাশে ফেলা হচ্ছে। ফলে ওই এলাকায় পরিবেশদূষণের পাশাপাশি বায়ুদূষণ হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানি, মাটি ও উদ্ভিদে দূষণ

২০২২ সালের নভেম্বর মাসে এমডিপিআইয়ের সয়েল সিস্টেম জার্নালে ‘ইমপ্যাক্ট অব ল্যান্ডফিল্ড লেচার অন দ্য সারাউন্ডিং এনভায়রনমেন্ট: এ কেস স্টাডি অন আমিনবাজার ল্যান্ডফিল্ড, ঢাকা (বাংলাদেশ)’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রবন্ধে গবেষণার জন্য ল্যান্ডফিল্ডের (আবর্জনা ফেলার স্থান) এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্য থেকে পাঁচ ধরনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে দুটি লিচেট নমুনা, তিনটি ভূপৃষ্ঠের পানির নমুনা, তিনটি ভূগর্ভস্থ পানির নমুনা, তিনটি মাটির নমুনা ও তিনটি উদ্ভিদের নমুনা।

ওই গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের আশপাশের পরিবেশগত নমুনা পৃষ্ঠতলের পানি, ভূগর্ভস্থ পানি, মাটি এবং উদ্ভিদের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ল্যান্ডফিল্ড স্থান থেকে আসা লিচেট (পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্য) উচ্চ মাত্রার দূষণ বহন করছে, যা ভূপৃষ্ঠের পানি, ভূগর্ভস্থ পানি, মাটি এবং উদ্ভিদকে দূষিত করছে। এর মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশগত উপাদানগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

যা বলছেন পরিবেশবিশেষজ্ঞ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনু প্রথম আলোকে বলেন, কেমিক্যাল–মিশ্রিত বর্জ্যসহ যেসব বর্জ্য পরিবেশদূষণে দায়ী, সেগুলো যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। সেগুলোর যে লিচেট বা এগুলোর গলিত পানি মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পানিতে চলে যাচ্ছে। বন্যা ও বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আশপাশের কৃষিজমি, নদীনালায় চলে যাচ্ছে। এতে পানি-মাটি দূষিত হচ্ছে। অনেক সময় এসব বর্জ্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে বাতাস দূষিত হচ্ছে। এসব দূষণ নানাভাবে মানবদেহে গিয়ে শ্বাসজনিত সমস্যা, স্ট্রোক, চর্মরোগ, ক্যানসারসহ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করছে।

জামাল উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণে সাভারকে দেশের প্রথম ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ বা অবক্ষয়িত বায়ু ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ দূষণ রোধে সবার আগে রাজনীতিবিদদের সচেতন হতে হবে।

গাজীপুরে মহাসড়কের পাশে বর্জ্যের পাহাড়

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সাভার-চন্দ্রা মহাসড়কের চক্রবর্তী এলাকা থেকে শুরু হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের এক নম্বর ওয়ার্ড। ময়লা-আবর্জনার শুরুটাও এখান থেকেই। এদিকে সিটির শেষ সীমানা ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গী এলাকাতেও একই অবস্থা। মহাসড়কের দুই পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্যের স্তূপই জানিয়ে দেয় এই নগরের অব্যবস্থাপনার চিত্র। এই দৃশ্য টঙ্গী থেকে শুরু হয়ে চান্দনা, তেলিপাড়া ও সালনা পর্যন্ত। শহরের শিববাড়ী সড়ক, লক্ষ্মীপুরা, দক্ষিণ ছায়াবীথি, জোড়পুকুর, হাড়িনাল বা রেলজংশন—প্রায় সব এলাকাতেই একইভাবে জমে আছে ময়লার স্তূপ। এ ছাড়া ময়লার পাহাড় তৈরি হয়েছে কড্ডা, বাইমাইল ও চক্রবর্তীতেও।

গাজীপুর নগরীতে ৩০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ছোট-বড় মিলিয়ে শিল্পকারখানা আছে প্রায় ৫ হাজার। অথচ এত লোকের, এত কলকারখানার বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। কোথাও দিনের পর দিন ময়লা জমে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, কোথাও আবার বৃষ্টির পানিতে মিশে সৃষ্টি করছে নোংরা জলাবদ্ধতা। নিয়মিত ঘর থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করলেও নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় যেখানে–সেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে।

শুধু বাসিন্দারাই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। গাজীপুর শহরের সড়কের পাশে ছোট একটি মুদিদোকান চালান করিম মোল্লা। তিনি বলেন, দোকানের সামনে ময়লার স্তূপ থাকলে ক্রেতারা আসতে চান না। অনেকেই নাক চেপে চলে যান।

পথচারীদের দুর্ভোগও কম নয়। টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকায় অফিসগামী নাজমুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন এই নোংরা পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে প্রতিদিন গড়ে চার হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এর একটি বড় অংশ সিটি করপোরেশন সংগ্রহ করলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই বর্জ্যের একটি অংশ নির্দিষ্ট স্থানে না গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শহরের বিভিন্ন খোলা জায়গা ও সড়কের পাশে। পরিকল্পিত ও আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ডের অভাব এই সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নগরবাসী বলেন, গাজীপুরে স্থায়ী কোনো স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড না থাকায় শহরের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও খোলা জায়গাই পরিণত হয়েছে অঘোষিত ডাম্পিং স্পটে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশ, শিববাড়ী সড়ক, ভোগড়া বাইপাস, তেলিপাড়া, কোনাবাড়ী, জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায়। সিটি করপোরেশনের সংগ্রহ করা বর্জ্যের বড় অংশ কাড্ডা-বাইমাইল এলাকায় নিয়ে ফেলা হলেও নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার অভাবে তা খোলা অবস্থায় জমা থাকে। শুধু শহরই নয়, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা সংলগ্ন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের আশপাশ ও শ্রীপুরের বনাঞ্চলেও বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া খালি জায়গা, নিম্নাঞ্চল ও জলাশয়েও নির্বিচার ময়লা ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি।

জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, ‘গাজীপুরে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টন বর্জ উৎপন্ন হচ্ছে। আমরা নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করছি, কিন্তু স্থায়ী ও আধুনিক ল্যান্ডফিল সুবিধা না থাকায় পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা যাচ্ছে না। জমিসংকটও বড় সমস্যা। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গাজীপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক হাসান ইউসুফ খাঁন বলেন, পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে এভাবে সড়ক ঘেঁষে বর্জ্য ফেলার নজির নেই। হাজার কোটি টাকা খরচ করে জনদুর্ভোগ লাঘবে সরকার সড়কের উন্নয়ন করলেও বর্জ্যের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। খোলা স্থানে এভাবে বর্জ্য ফেলায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, সংক্রামক ব্যাধিও ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক জায়গায় বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টাও করা হচ্ছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া, যা আশপাশের পরিবেশকে আরও দূষিত করছে। বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, উন্মুক্ত স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে অনেক ‘ডাস্ট পার্টিকল’ রয়েছে, যা বাতাসে ওড়ে। আমরা আবার তা শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করি। ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ডাম্পিং করতে হবে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে।’

গাজীপুর সিটির প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার বলেছেন, নগরকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে গড়তে ইতিমধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় শহরে ময়লা-আবর্জনার পরিমাণও বেশি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ডাম্পিং স্টেশন ও ময়লার ভাগাড় স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নগরজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।