আয়াস, মারজিয়াদের বিরুদ্ধে কোন ধারায় কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার আল নূর মোহাম্মদ আয়াশ ও তাঁর সহযোগীদের পৃথক মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার বিকেলে ঢাকার সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণেছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম (আল নূর মোহাম্মদ) আয়াসসহ চারজনকে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।

চারজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় দণ্ডবিধির ১২০ (খ), ১৫৩ (ক) ও ২৯৫ (ক) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ধারাগুলোতে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার কথা রয়েছে।

পুলিশ আয়াসসহ চারজনকে রিমান্ডের জন্য যে আবেদন করেছে তাতে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়িয়ে ধর্মীয় অনুভূতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে।

আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধির ১২০খ ধারা হলো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। কোনো অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে এ ধারায় মামলা হতে পারে।

ষড়যন্ত্রের ধরন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তির ওপর দণ্ড নির্ভর করে। গুরুতর অপরাধের ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধে সহায়তার মতো শাস্তি হতে পারে। অন্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধির ১৫৩ ক ধারা হলো বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে শত্রুতা ছড়ানো। কথা, লেখা, চিহ্ন বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণা ছড়ানো কিংবা তা ছড়ানোর চেষ্টা এ ধারার অপরাধ। এতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে দণ্ডবিধির ২৯৫ ক ধারা হলো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। কোনো শ্রেণির মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে কথা, লেখা বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে তাদের ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করা কিংবা অপমানের চেষ্টা এ ধারার অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে আইন অনুযায়ী, এসব ধারায় মামলা হওয়া মানেই আসামিরা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করবেন।

৫ অক্টোবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর ফুটপাতের পাশের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়।

১০ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় আঁকা গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টা করে আলোচনায় আসেন আয়াস। তিনি একসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব ছিলেন। তবে সাম্প্রতিককালে নানা ঘটনা ঘটিয়ে তিনি বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।

আয়াস (২৯) ছাড়াও মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) ও মারজিয়া খন্দকার রিমিকে (২৭) গতকাল গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তদন্তের স্বার্থে ৪ আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ।
আদালতে আসামি পক্ষের আইনজীবী মনির হোসাইন বলেন, চার আসামির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে জেলে যাওয়ার মতো উপাদান নেই। একটা চড় মেরে সমাধান করা যেত, রিমান্ড তো বহুদূর।

অবশ্য আদালত চারজনকে পৃথক মেয়াদে রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন। এর মধ্যে আয়াস ও সাকিবুলের তিন দিন এবং সুজন ও মারজিয়ার দুই দিন করে রিমান্ডের আদেশ হয়েছে।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাদের এই কার্যক্রম সরকারের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করা। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আমাদের যে সম্প্রীতির সংস্কৃতি, তাঁরা তা বিনষ্ট করছেন। মবের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন।’

ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, তাঁদের কাজ হচ্ছে উন্নয়নে বাধা দেওয়া, ভাইরাল হওয়া। এ জন্য তাঁরা গালাগাল করেন। ধর্মীয় উসকানি দিতে চেষ্টা করেন। তাঁদের পেছনে একটা চক্র আছে, সেটি জানা দরকার।