আলোচনা, আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনার মতো আয়োজনে বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবী চেতনার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপিত হলো রাজধানীতে। ১৫ আগস্ট অমিত প্রতিভাবান কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে জন্ম হয়েছিল তাঁর। প্রয়াত হন ২১ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ মে। অকালপ্রয়াত এই কবির রচনা গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাহস ও প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। কবির সেই রচনা ও বিপ্লবী জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা করে শতবর্ষে শ্রদ্ধা জানানো হলো কবিকে।
বারবার তাঁর কাছে ফিরতে হবে
প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে ‘সুকান্ত: শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রথম পর্বে ছিল কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা। এতে ‘সুকান্ত: মানবমুক্তির এক স্বপ্নবান কবি’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান। পরে প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক এম এ আজিজ মিয়া ও কবি হাসান ফকরী। সভাপতিত্ব করেন বিবর্তনের সভাপতি এ এস এম কামাল উদ্দিন।
প্রবন্ধে মফিজুর রহমান বলেন, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় সাম্যবাদ ও দেশাত্মবোধ প্রধান বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর জীবন ও কবিতা এক অভিন্ন সুতায় বাঁধা। ফলে তাঁর কবিতাকে বুঝতে হলে বিপ্লবী শ্রেণিচেতনা, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে হবে। তিনি রাজনীতিকে করে তুলেছিলেন শিল্প। আর সেই শিল্পকে করেছিলেন মানবমুক্তির হাতিয়ার।
আলোচকেরা বলেন, ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য এখনো আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ যত দিন বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সম-অধিকারের সমাজ বিনির্মাণের জন্য সংগ্রাম করবে, সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা তত দিন সেই সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা মানুষের চিন্তা ও মনোজগৎকে নাড়া দিয়ে যায়। সে কারণেই বারবার তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।’
আলোচনার পরে ছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা আবৃত্তি, কবিতায় সুরারোপিত গান ও নৃত্যের সমন্বয়ে বিবর্তনের শিল্পীদের এক মনোজ্ঞ পরিবেশনা। ‘এই বন্ধ্যা মাটির বুক চিরে এইবার ফলাব ফসল’ কবিতায় সুর করা গানের সঙ্গে নৃত্য দিয়ে পরিবেশনা শুরু হয়েছিল। এরপর ছিল সমবেতকণ্ঠে ‘বোধন’ কবিতা থেকে গান ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’। একেকটি পরিবেশনার পরে ছিল কবিতার প্রেক্ষাপট ও সংগ্রামী চেতনার ধারাভাষ্য। বিরতিহীন এই পরিবেশনায় কবিতা ও গানগুলো মধ্যে আরও ছিল—‘লেনিন’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ’, ‘সাবাস বাংলাদেশ এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়’, ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি’, ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’, ‘বেজে উঠল কি সময়ের ঘড়ি’, ‘হে মহাজীবন’, ‘রানার রানার’—এমন বেশ কিছু কালজয়ী কবিতায় সুরারোপিত গান ও কবিতার আবৃত্তি পরিবেশনা। শেষ হয়েছিল সমবেত কণ্ঠের গান ‘বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,/ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’ পরিবেশনা দিয়ে।
মুক্ত আসরের গান, কবিতা ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ
ধানমন্ডির বিডিওএসএন কার্যালয়ে ‘শতবর্ষে সুকান্ত’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মুক্ত আসর’ এবং ‘স্বপ্ন ৭১ প্রকাশন’। অনুষ্ঠানে ছিল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, তাঁর গান, কবিতা আবৃত্তি ও ‘শতবর্ষে সুকান্ত’ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা। অনুষ্ঠানে অংশ নেন কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, আবৃত্তিশিল্পী ও সাহিত্যানুরাগীরা।
প্রথম পর্বে ছিল আলোচনা ও স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন। আলোচনায় অংশ নেন শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ আবদুল হাই, গবেষক প্রশান্ত কুমার রায় এবং মুক্ত আসরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং শতবর্ষে সুকান্ত স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক আবু সাঈদ।
আলোচকেরা বলেন, ‘কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য চর্চা করা অত্যন্ত জরুরি। কবি আজীবন শোষণ-বঞ্চনা থেকে মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রাম করে গেছেন। সব মানুষের জন্য সমান অধিকারের মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। সেই আকাঙ্ক্ষাই কবিতায় প্রকাশ করেছেন। আমাদের দেশে এখনো আমরা বৈষম্যমুক্ত শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি। সে কারণে জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে স্মরণ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।’
আলোচকেরা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ও আদর্শকে তুলে ধরতেই ‘শতবর্ষে সুকান্ত’ শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এই স্মারকগ্রন্থের প্রথম অংশে রয়েছে স্মৃতিকথা ও দ্বিতীয় অংশে শতবর্ষ নিয়ে কবিকে আলোচনা। আলোচনার পর স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল আবৃত্তি ও গান। আবৃত্তি করেন মুক্ত আসরের সাহিত্য সম্পাদক সাহিনা মিতা, নাজমুন নাহার, জেসমিন বন্যা, ইয়াতুল নেশা রুমা ও সুব্রত ভট্টাচার্য। গান গেয়ে শোনান শাহিন আক্তার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্ত আসরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আয়শা জাহান নূপুর।