বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে বরণ করে নিতে দিনব্যাপী নানা আয়োজন ছিল প্রথম আলো বৈশাখী উৎসবে। নগরজীবনের কোলাহলের মধ্যেও এক দিনের জন্য আনন্দ ও সাংস্কৃতিক সংযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে নতুন বছরের এ আয়োজন।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ইউনাইটেড সিটির মাদানী অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত শেফস্ টেবিল কোর্টসাইডে জাতীয় সংগীত ও বৈশাখের গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে অনুষ্ঠান চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
শেফস্ টেবিলের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজিত উৎসবে জাতীয় সংগীতের পরপরই গীতাঞ্জলি একাডেমি অব ফাইন আর্টসের শিশুশিল্পীরা গেয়ে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। তখন মঞ্চের সামনে থাকা অতিথি ও দর্শনার্থীরাও তাদের সঙ্গে সুর মেলান। সংগীত পরিবেশনা শেষে গীতাঞ্জলি একাডেমি অব ফাইন আর্টসকে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক।
এরপর শুরু হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। সেখানে দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে অংশগ্রহণ করে শিশু-কিশোরেরা। বৈশাখের প্রথম দিনের সকালে শেফস্ টেবিল প্রাঙ্গণের সবুজ ঘাসের ওপর লালগালিচায় বসে রংতুলিতে নানা চিত্র তুলে আনে শিশু-কিশোরেরা। পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিযোগীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকেন অভিভাবকেরা। এরপর হয় শিশুদের হাতের লেখা প্রতিযোগিতা।
মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে রাজধানীর উত্তরা থেকে উৎসবে এসেছেন গৃহিণী শাহীন হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে এসে বাঙালির চিরায়ত উৎসবের আবহই দেখার সুযোগ হয়েছে।’
প্রথম আলোর উদ্যোগে ও শেফস্ টেবিল কোর্টসাইডের সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসবে দিনভর শীতলপাটি, টেপাপুতুল, চুড়ি, খেলনার মতো লোকজ পণ্যের প্রদর্শনী ছিল দর্শনার্থীদের জন্য। মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল রণপা, হাওয়াই মিঠাই, বানরনাচ, বোম্বে ক্যান্ডি। আরও ছিল লাটিম, মার্বেল, লুডো, ষোলোঘুঁটি, বিস্কুট দৌড়ের মতো দুরন্ত শৈশবের খেলা।
পল্লবী এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন গৃহিণী আয়েশা কবির। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এখানকার উৎসবের খবর দেখছিলাম। এসে ভালো লাগছে। অনেক সুন্দর আয়োজন। নগরবাসীর জন্য এমন আয়োজন আরও বেশি হওয়া দরকার।’
দিনব্যাপী উৎসবের আবহ
প্রথম আলোর বৈশাখী উৎসব ঘিরে শেফস্ টেবিল এলাকাজুড়ে বসে আবহমান বাংলার নানা অনুষঙ্গ। এর মধ্যে রয়েছে কামারপাড়া, তাঁতিপাড়া, বাঁশের কুটির, শীতলপাটি ও টেপাপুতুল, কুমারপাড়া, নকশিকাঁথা, মুখোশ ও সরা আর্ট, ক্যারিকেচার, জাদু প্রদর্শনী, পুতুলঘর, অরিগ্যামির স্টল। আরও রয়েছে নাগরদোলা, হাওয়াই মিঠাই, রঙিন সাজঘর, চুড়ির দোকান।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। নতুন বছরের এ আয়োজন আরও রঙিন হয়ে ওঠে প্রথম আলোর কর্মী, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও দর্শনার্থীদের মুখর উপস্থিতিতে। রঙিন শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে আয়োজনস্থলে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ; নতুন বছরের প্রথম দিন হয়ে ওঠে রঙিন।
উৎসবে শিশু-কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় হাতের লেখা প্রতিযোগিতা এবং ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’। পাশাপাশি ক্যারিকেচার ও অরিগ্যামির মতো সৃজনশীল কর্নারগুলো হয়ে ওঠে শিশুদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
বাড্ডার ক্যামব্রিজ গ্রামার স্কুলের শিক্ষার্থীদের ১১ জনের একটি দল নিয়ে বৈশাখী উৎসবে আসেন প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল মোক্তার হোসেন ও ভাইস প্রিন্সিপাল মিমিয়া খাতুন। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, বাংলা নববর্ষের উৎসব ও আয়োজন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতেই তাঁদের এখানে নিয়ে এসেছেন। শিক্ষার্থীরা সব কটি বিষয় দেখছে এবং শিখছে।
উৎসবজুড়ে ছিল সংগীত, গল্প বলার আসর, পুতুলনাচ, জাদুসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশনা। দর্শনার্থীদের জাদু দেখান চট্টগ্রাম থেকে আসা শিল্পী রাজীব বসাক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শিল্পীর জাদুর কাঠিতে নানান কিছু দেখেন উপস্থিত সব বয়সের দর্শনার্থীরা।
উৎসবে গল্প বলার আসর জমান আবৃত্তিশিল্পী মাহমুদা আখতার। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী পুলক অধিকারী। আর ক্যারিকেচার কর্মশালা পরিচালনা করেন শিল্পী আরাফাত করিম ও এস এম রকিবুর রহমান।
এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিচারকাজ পরিচালনা করেন শিল্পী আবদুল মান্নান, ফাবেহা জেবা, আনিসুজ্জামান সোহেল ও অশোক কর্মকার। এই শিল্পীরা এবং ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন হাসান রশীদ, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক, সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন মঞ্চে শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
প্রতিযোগিতায় বিজয়ী যারা
হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় ‘ক’ বিভাগে প্রথম হয়েছে শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বেলিসা নাসারাত, দ্বিতীয় আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেবাস্মিতা কুন্ডু এবং তৃতীয় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসায়বাহ হায়দার রাহা।
একই প্রতিযোগিতায় ‘খ’ বিভাগে প্রথম হয়েছে উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রোকসানা আহমেদ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির সুবাহা তাবাচ্ছুম এবং তৃতীয় আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিহা আলম।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ‘ক’ বিভাগে প্রথম হয়েছে এলপিএসএসের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসাইবা সালাম, দ্বিতীয় হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির অর্জুন সাহা এবং তৃতীয় লাইফ প্রিপারেটরি স্কুলের নার্সারির শিক্ষার্থী নুসায়ের সালাম।
একই প্রতিযোগিতায় ‘খ’ বিভাগে সব কটি পুরস্কারই জিতেছে হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে প্রথম সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তি সাহা, দ্বিতীয় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাজমা জাহা খান এবং তৃতীয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আপ্রদিতি পাত্র।
উৎসবের যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে মেথডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাবির আহমেদ, কর্নেল আসিবুর রহমান স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জুনায়েদ আহমেদ এবং তৃতীয় মেথডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফালাক।
পুরো আয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালের একটি চিকিৎসক দল। এ ছাড়া মেলায় প্রদর্শনী স্টল ছিল এসিআই মোটরসের ইয়ামাহা মোটরসাইকেল ও ইকো ফ্লো-পোর্টঅ্যাবল পাওয়ার সিস্টেমের।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন মাহবুবা সুলতানা ও সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি।