দণ্ডিতরা আপিল করতে চান না, বললেন আইনমন্ত্রী

‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আইনি প্রতিনিধিত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১০ জুনছবি: প্রথম আলো

পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চান না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, তারপরও তাঁরা যেন আপিলে অংশ নেন, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।

আজ বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আইনি প্রতিনিধিত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষাকেন্দ্র সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড লিগ্যাল স্টাডিজ এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া তুলে ধরেন মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর চেয়ে দ্রুতগতিতে কাজ করা সম্ভব ছিল না। ডিএনএ পরীক্ষা করতে গিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়।...সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তারপরও সরাসরি ফাঁসির রায়ের দিকে এগোনো যায়নি। কারণ, আইনের শাসন মেনে চলতে হবে। ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী তাঁর দায়িত্ব অনুযায়ী আসামির পক্ষে আদালতে বক্তব্য দেন। এ কারণে তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানের শিকার হতে হয়েছে। সবাই তাঁকে দোষারোপ করেছে; কিন্তু আইনের সাধারণ নীতি হচ্ছে, প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে আইনের সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একটি ন্যায়সংগত বিচার সম্পন্ন করা হয়েছে।

এই মামলায় এখন নতুন প্রশ্ন এসেছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন প্রশ্ন এসেছে যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হবে কি না? আসামিপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তাঁরা আপিল করতে চান না। তারপরও আমি ব্যক্তিগতভাবে কারা মহাপরিদর্শককে বলেছি তাঁদের বোঝাতে, যাতে তাঁরা অন্তত আপিল করার সুযোগ গ্রহণ করেন।...সেই জেল আপিল ও ডেথ রেফারেন্স একসঙ্গে হাইকোর্টে শুনানি হলে আমরা নিশ্চিত হতে পারব যে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’

মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। এটি মানবাধিকারের প্রতি আমার অঙ্গীকারের অংশ। কিন্তু তারপরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ, প্রতিটি সাধারণ নীতিরই কিছু ব্যতিক্রম থাকে। যখন দেখি, আট বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, সেখানেই ক্ষান্ত হয়নি; তার...কেটে ফেলা হয়েছে, পানি দিয়ে ধুয়ে সব ধরনের আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে, তখন সমাজের একজন সদস্য হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আমার মনেও প্রশ্ন জাগে, এদের বিচার কেন প্রয়োজন? যে নিজেই স্বীকার করছে, সে এমন একটি অপরাধ করেছে।’

বেশ কয়েকটি শিশুকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার উদাহরণ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সমাজ থেকে যদি অপরাধীদের ফাঁসির দাবি ওঠে, সেই দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতা অনেক সময় থাকে না। নৈতিক বাস্তবতাও সেখানে মাথা নত করে। এটাই আমাদের বাস্তবতা।’

মৃত্যুদণ্ড বিলোপ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ১১৩টি দেশ সম্পূর্ণভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে। বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। সভ্যতার একটি পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে সমাজকে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যখন আট বছরের একটি শিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়, তখন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা মৃত্যুদণ্ড বিলোপের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হয়। আশা করি, বাংলাদেশ একদিন সেই পর্যায়ে পৌঁছাবে।

সেমিনারে ‘ লিগ্যাল রিপ্রেজেন্টেশন অব ডেথ পেনাল্টি কেসেস ইন বাংলাদেশ: এন এম্পিরিক্যাল অ্যান্ড কনসেপচুয়াল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্টের সহায়তা এই গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে।

গবেষণায় নমুনা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩৯ জন ব্যক্তির মামলার নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাঁদের পরিবারের সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

৩৩টি অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনী ও আন্তর্জাতিক অপরাধসংক্রান্ত আইন বাদ দিলে বর্তমানে ৩৩টি অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি অপরাধ প্রাণহানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এবং এসব অপরাধ আন্তর্জাতিক আইনে নির্ধারিত ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মানদণ্ড পূরণ করে না।

অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, গত তিন দশকে জনরোষ প্রশমনের সহজ উপায় হিসেবে আইনপ্রণেতারা বারবার নতুন নতুন মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করেছেন। কিন্তু এতে বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং এগুলো গভীর সংকটের ওপর সাময়িক প্রলেপ হিসেবে কাজ করেছে।

আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও তাঁদের পরিবারের সন্তুষ্টির হার বেসরকারি আইনজীবীদের ক্ষেত্রে ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, আর রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। এই বাস্তবতায় পরিবর্তন প্রয়োজন, এটি স্পষ্ট। এ বিষয়ে কিছু নির্দেশিকাও থাকা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড লিগ্যাল স্টাডিজের পরিচালক ও আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদার সভাপতিত্বে আজকের এই সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। এ ছাড়াও ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্টের উপনির্বাহী পরিচালক সল লরফ্রেন্ড বক্তব্য দেন। প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার কনি পার্কার ধীনাকরণ গবেষণার পরিচিতি তুলে ধরেন। গবেষক রাফিদ আজাদ সৌমিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন।