তারা যমজ ভাই, হাসানের মৃত্যু, হোসেন আক্রান্ত

  • হাম ও ‘সন্দেহজনক হামে’ মৃত্যু আরও ১১ শিশুর।

  • ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মৃত্যু ১৪৯ শিশুর।

যমজ ভাই হাসান ও হোসেনছবি: পরিবার থেকে

যমজ দুটি শিশু। নাম হাসান ও হোসেন। বয়স আট মাস। তাদের যখন জন্ম হয়, তখনই মা সুমাইয়ার মৃত্যু হয়। হাসান ও হোসেন বেড়ে উঠছিল ওদের ফুফুর কাছে। কখনো কখনো নানির কাছেও থাকত।

দেশজুড়ে হামের যে প্রাদুর্ভাব চলছে, তাতে আক্রান্ত হয়েছে হাসান ও হোসেন। গত ২৭ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাসান মারা গেছে। এ মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম সন্দেহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক দুর্দশার কারণে হোসেনের চিকিৎসা চলছে বাড়িতেই।

হোসেনের বাবা দিনমজুর সোহেল রানা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, হাসান–হোসেনের মা তাঁর ছেলেদের মুখ না দেখেই মারা গেছেন। ছেলেরাও মায়ের মুখ দেখেনি। অনেক চেষ্টা করেও তিনি হাসানকে বাঁচাতে পারেননি। হোসেনকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারছেন না দাবি করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যা কপালে রাখছে, তা–ই হইব।’

আরও পড়ুন

আরও ১১ শিশুর মৃত্যু

এদিকে ‘সন্দেহজনক হাম’ বা হামের উপসর্গ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে মোট ২১ শিশু মারা গেছে। আর সন্দেহজনক হাম নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২৮ শিশুর। দুয়ে মিলে শিশুমৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১৪৯টিতে।

অন্যদিকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৮। আর সন্দেহজনক হাম নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮৮৩। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩৫।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঢাকা কার্যালয় গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ২০২২ সালে ছিল ১ দশমিক ৪১, বর্তমানে তা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

সংক্রমণের মূল কারণ হিসেবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার ক্ষেত্রে গাফিলতি হয়েছে। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে আগের সরকারকে দায়ী করছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আগের সরকারের গাফিলতির কারণে হামের টিকার সংকট তৈরি হয়েছে।

চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি সাত মাস বয়সী শিশু সজিব মিয়া। ভিডিও কলে আত্মীয়কে দেখাচ্ছেন বাবা। গতকাল সকালে রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে
ছবি: মীর হোসেন

হাসানকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, হাম ছড়িয়েছে দেশের ৫৬ জেলায়। বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুসারে, সমুদ্র উপকূলের জেলা বরগুনা সদরে হামের সংক্রমণের হার ২৯৪ দশমিক ৫, অর্থাৎ বরগুনা সদরে প্রতি ১০ লাখে সংক্রমণ ঘটেছে ২৯৪ দশমিক ৫ জনের। এত ব্যাপক সংক্রমণ দেশে আর কোথাও নেই।

হাসান
ছবি: পরিবার থেকে

বরগুনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর জেলায় এ পর্যন্ত (সোমবার পর্যন্ত) হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪০ জন। এর মধ্যে ৩৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ৩ জন মারা গেছেন। অন্যরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

ঢাকায় মারা যাওয়া হাসানকে নিয়ে তার ফুফু মোসাম্মৎ নার্গিস ও ফুফা মো. লোকমান ২৫ দিন বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছেন। নার্গিস মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমে হাসানের সর্দি ও জ্বর হয়। বরগুনার পাথরঘাটার স্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। তারপর বরগুনা সদর, বরিশাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পরে হাসান মারা যায়। মৃত্যুর আগে হাসানের নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছিল।

আরও পড়ুন
হোসেন
ছবি: পরিবার থেকে

নার্গিস বলেন, চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ায় প্রায় ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।

হাসানের বাবা সোহেল রানা বড় ছেলে আবদুল্লাহ (৫) ও হোসেনকে নিয়ে পাথরঘাটায় ছিলেন। তিনি ধারদেনা ও ঋণ করে টাকা পাঠাতেন বোন ও বোনের স্বামীর কাছে। হোসেনকেও ঢাকায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার কথা ছিল। তবে তার আগেই হাসান মারা গেল।

খরচ কত হয়েছে, তার হিসাবও রাখেননি সোহেল রানা। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলে বাঁচে না, এই সময় তো আর টাকাপয়সা হিসাব করে খরচ করার উপায় ছিল না। কত টাকা খরচ হইছে, তারও হিসাব নাই। তবে ৭০ হাজার টাকার বেশি খরচ হইছে।’

হোসেন বর্তমানে তার নানির কাছে আছে। বরিশাল থেকে পাথরঘাটায় চিকিৎসক আসেন। তিনি হাসানকে দেখে ওষুধ দিয়েছেন বলে জানান সোহেল রানা।

অর্থকষ্টে আটকে হোসেনের চিকিৎসা

হোসেনের নানির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয় বলে জানান সোহেল রানা। এদিকে স্ত্রী ও এক সন্তানের চিকিৎসার পেছনে তাঁর অনেক অর্থ ব্যয় হওয়ায় এখন হোসেনকে উন্নত চিকিৎসা করানোর অবস্থা তাঁরও নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘টাকাপয়সার সংকট চলছে। জায়গাজমিও নাই যে তা বেইচ্যা ছেলের চিকিৎসা করব।’

একটি ইটভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন সোহেল রানা। দৈনিক মজুরি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য ছুটতে গিয়ে নিয়মিত কাজও করতে পারছেন না বলে জানান তিনি। বলেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয়েছিল হাসান ও হোসেনের। এরপর ওদের মায়ের খিঁচুনিসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। অচেতন অবস্থায় ১০ দিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকার পর মারা যান সুমাইয়া।

স্ত্রীর চিকিৎসায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয় বলে জানান সোহেল রানা। তিনি বলেন, তখন যে ঋণ নিয়েছিলেন, তা–ও শোধ করতে পারেননি। এর মধ্যেই হাসানের চিকিৎসার জন্য আবার ধারদেনা করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন