চাকরি থেকে অবসরে গেছেন বেলায়েত (ছদ্মনাম) সাহেব। সারা জীবনের জমানো টাকা দিয়ে ঢাকার কাছেই ১০ কাঠা জমি কেনার জন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রথমে বায়না এবং এরপর সাফ কবলা দলিলও করেছেন। তিনি যে জমি কেনেন, তা একই দাগে ২৫ কাঠা জমি ছিল। জমি কেনার পর তিনি জমি দখলে নিতে এবং চারদিকে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে জমিতে আপাতত কিছু ফলের বাগান করতে চান। অবসর সময়টা এখানে এসে আপাতত কাটাবেন বলে মনস্থির করেন। যখনই প্রাচীর দেওয়ার কাজ শুরু করলেন, কিছু লোক এসে বাধা দিয়ে বললেন, এখানে তাঁদের জমির অংশ আছে। বেলায়েত সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। পরে দেখা গেল, তার ক্রয়কৃত জমির দাগের পাঁচ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। হয়তো ক্রেতা জেনেবুঝেই তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
আরেকটি ঘটনা এ রকম, এক ব্যক্তি জমি কেনার কিছুদিনের মধ্যে বিক্রেতার সহশরিকেরা (যাঁরা পাশের জমির মালিক) অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশনের মামলা করেছে জমি ফেরত পাওয়ার জন্য। এখন ক্রেতাকে আদালতে লড়তে হবে এ মোকদ্দমা।
জমি নিয়ে এ রকম প্রতারণা এবং বিরোধ হরহামেশাই হচ্ছে। আমাদের দেশে জমিজমা নিয়ে মামলা–মোকদ্দমার সংখ্যাই বেশি। জমির বিরোধ নিয়ে যেমন দেওয়ানি মোকদ্দমা হয়, তেমনি হয় ফৌজদারি মামলাও। জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে মানুষকে ঠকিয়ে বা প্রতারণা করার প্রবণতাই বেশি। এ ছাড়া ক্রেতার অসাবধানতা এবং জমি ক্রয়সংক্রান্ত প্রাথমিক বিষয়গুলো সম্পর্কে অজ্ঞতাও কম দায়ী নয়।
জমি কেনায় করণীয়
১. জমি কেনার আগে জমির ক্রেতাকে জমির বিভিন্ন দলিল বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে, জমির মালিকের মালিকানা বৈধতা ভালো করে যাচাই করতে হবে।
অন্যথায় জমি কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হতে হবে কিংবা জমির মূল অংশ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। মালিকানা না যাচাই করে জমি কিনলে ভবিষ্যতে মামলা-মোকদ্দমায়ও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। যে জমি বিক্রয় করা হবে, ওই জমিতে বিক্রয়কারীর জমির মালিকানা আছে কি না, প্রথমে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
এ জন্য জমিটির সর্বশেষ রেকর্ডে বিক্রয়কারীর নাম উল্লেখ আছে কি না, তা দেখতে হবে। সিএস, এসএ, আরএস, বিএসসহ অন্যান্য খতিয়ানের ক্রম মিলিয়ে দেখতে হবে।
জমির দলিল বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। বিক্রীত দলিল থেকে শুরু করে ভূমি উন্নয়ন কর খতিয়ান—সবই হচ্ছে দলিল। ক্রেতাকে প্রথমেই দেখতে হবে সবশেষে যে দলিল করা আছে, তার সঙ্গে পূর্ববর্তী দলিলগুলোর মিল আছে কি না। বিশেষ করে ভায়া দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা দেখতে হবে। ভায়া দলিল হচ্ছে মূল দলিল, যা থেকে পরের দলিল সৃষ্টি হয়।
২. দলিলে দাতা ও গ্রহীতার নাম, ঠিকানা, খতিয়ান নম্বর, জোত নম্বর, দাগ নম্বর, মোট জমির পরিমাণ ভালো করে দেখতে হবে। যে দাগ পূর্বের দলিলে থাকে না, সেই দাগ দলিলে অন্তর্ভুক্ত করে হস্তান্তর করলেও এর মালিকানা দাবি করা যাবে না।
৩. যেকোনো উপায়ে জমির মালিকানা হলেও জমিটির নামজারি ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। বিক্রয়কারী ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকলে বণ্টনের মোকদ্দমা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। জমিতে ওয়ারিশদের কোনো অংশ থাকা, না থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। যদি জমিটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে, তাহলে বণ্টননামায় জমি দখলের কথা উল্লেখ থাকার বিষয়টি দেখতে হবে।
৪. জমিটি বিক্রয়কারীর দখলে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। এ জন্য সরেজমিনে নকশার সঙ্গে জমিটির বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী ভূমিমালিকদের কাছ থেকে দাগ-খতিয়ান জেনে মিলাতে হবে।
৫. কৃষিজমির ক্ষেত্রে অংশীদাররা অগ্রক্রয়াধিকার প্রয়োগ করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
৬. জমিটি খাস কি না এবং জমিটির সঙ্গে সরকারের খাসজমি আছে কি না কিংবা সরকারের কোনো স্বার্থ থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। জমিটি অর্পিত সম্পত্তি কিংবা পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় আছে কি না, সেটাও দেখতে হবে।
৭. ঋণের জন্য জমিটি কোনো ব্যাংকের কাছে বন্ধক আছে কি না, তার খোঁজ নিতে হবে।
৮. রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জমিটির দান ও বেচাকেনার সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন। জমিটি এর আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি করেছে কি না, খোঁজ নিতে হবে।
৯. সব সময় জমির দলিল দেখার সময় বিক্রেতার কাছে মূল দলিলগুলো চেয়ে নিতে হবে। ফটোকপি দেখে জমি কেনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হলে কী করবেন
কোনো জমি কেনার ক্ষেত্রে যদি দেখা যায়, জমি নিয়ে কোনো মামলা–মোকদ্দমা আছে, তাহলে তা কোনোভাবেই কেনা উচিত হবে না। আর জমিটি কেনার পর যদি মামলা-মোকদ্দমার বিষয়টি জানা যায়, তাহলে প্রথমেই মামলার কাগজপত্র তুলতে হবে এবং মামলার ধরনটি আগে বুঝতে হবে। যদি দেওয়ানি মোকদ্দমা হয়, তাহলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে পক্ষভুক্ত হয়ে মোকদ্দমাটি পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আদালতে পক্ষভুক্তির আবেদন করতে হবে। যদি এমন হয় জমি কিনে দখলে যাওয়া যাচ্ছে না বা দখল করতে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তাহলে দেওয়ানি আদালতে মালিকানাসহ দখলের জন্য মোকদ্দমা করতে হবে। যদি এমন হয় যে জমি দখলে আছে, কিন্তু অন্য কেউ এসে মালিকানা দাবি করছে, সে ক্ষেত্রে জমির মালিকানা চেয়ে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা করা যায়। জমিটি যেন অন্যের দখলে না যায়, সে জন্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে করা যায় চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মোকদ্দমা। এর সঙ্গে জমি থেকে যেন বেদখল না করতে পারে, সে জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশের জন্যও আবেদন করা যায়। যদি জমির দখল নিয়ে অন্য কেউ ঝামেলা সৃষ্টি করে কিংবা দখলে নিতে চায়, তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায়ও কার্যক্রম গ্রহণ করা যায়। কোনো দলিল বানানো হলে বা জাল হলে দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মোকদ্দমা করা যায়। এ ছাড়া দলিল জালিয়াতির জন্য ফৌজদারি মামলা করার সুযোগও রয়েছে।
তানজিম আল ইসলাম বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী