প্রথম আলোর দগ্ধ ভবনে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী: ধ্বংসের আগুন পেরিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ঐক্যের ডাক

বসন্তের রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দৃশ্যছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবন থেকে ছড়িয়ে গেল আলো। আজ বুধবার বসন্তের রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভবনে শুরু হলো ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য সৃষ্টির প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

আজ বেলা ১১টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনের সামনে দেশের সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যমের কর্মীরা প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান এই শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন।

গত বছর ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে একদল প্রতিহিংসাপরায়ণ উগ্রবাদী লোক প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক তাণ্ডব করে প্রথম আলো কার্যালয়ের শার্টার ও বড় বড় কাচের দরজা ভেঙে ফেলে। ভেতরে ঢুকে তারা লুটপাট চালায়। জিনিসপত্র ভাঙচুর করে ও আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরপর তারা দ্য ডেইলি স্টার ভবনে হামলা করে। তারা ডেইলি স্টার ভবনেও ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।

শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আগতদের একাংশ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

প্রথম আলোয় এই সর্বাত্মক হামলার ফলে সেই রাতে প্রথম আলোর অনলাইন সংবাদপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম আলোর ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও প্রথম আলো ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।

অগ্নিকাণ্ডকবলিত ভবনটি নিয়ে শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের ‘আলো’ নামের এই প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আজ সম্পাদক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমকর্মীদের এই উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা এখানে শুধু বিধ্বস্ত ভবন দেখব না; চিন্তাকে রুদ্ধ করার ঘৃণ্য হামলা এবং সেখান থেকে উত্তরণে চেষ্টাও দেখব। আমদের কথা বলার অধিকারে সোচ্চার থাকার প্রেরণাও জোগাবে এই প্রদর্শনী।’

শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’র শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান বক্তব্য দিচ্ছেন
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তিনি এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর নতুন প্রাণশক্তির উত্থানের বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছেন। এখানে যেসব বস্তু দগ্ধ হয়েছে, সেগুলো যেন এই কর্মস্থলের প্রাণস্পন্দনের কথা ও দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণার কথাই বলেছে। সেই যন্ত্রণা ও সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানো—এই উভয় বিষয়কে নান্দনিকভাবে তিনি তুলে ধরেছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি কেবল এ দুটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ নয়; এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আগুন। চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আগুন। এই হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও লক্ষ্য ছিল।

মাহফুজ আনাম নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ হামলার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হোক। এর নেপথ্যে পরিকল্পনাকারী ছিল কারা, হামলা করেছে কারা, তাদের প্রত্যেকের মুখোশ জনসমক্ষে উন্মোচন করতে হবে। তিনি এই বিপর্যয়ের মধ্যেও সাহসের সঙ্গে কাজে ফিরে এসে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবাদপ্রবাহ চালু রাখার জন্য উভয় প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকসহ সব কর্মীর সাহস ও নিষ্ঠার কথা স্মরণ করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, প্রথম আলো ভবন যেভাবে পোড়ানো হয়েছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে পুড়িয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা যায় না। এই পোড়া ভবন নতুন করে শিল্পকর্ম হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি সাংবাদিকেরা এই হামলায় ভয় পেয়ে পালিয়ে যাননি। পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাঁরা সাহসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনে আয়োজিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’র একটি শিল্পকর্ম
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

এ কে আজাদ বলেন, ‘ভবিষ্যতেও হয়তো সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর আঘাত আসতে পারে। এই শঙ্কা থেকেই পরিস্থিতি প্রতিহত করার জন্য সাংবাদিকদের প্রস্তুতি নিতে হবে। ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই বৃহত্তর ঐক্যের জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। সম্প্রতি গণমাধ্যম সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম চলতে থাকবে। আমাদের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করতে হবে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ প্রদর্শনী দেখে তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রথম আলোয় যে ভয়ানক বর্বরতা চালানো হয়েছে, সেখানে একই সঙ্গে  ধ্বংস ও সৃষ্টির সমন্বয় করেছেন শিল্পী। প্রদর্শনীটি খুবই বিস্ময়কর ও গভীর অর্থময়তা প্রকাশ করেছে। তিনি এই প্রদর্শনীর ভিডিও চিত্র ও বিষয়বস্তু বাংলা–ইংরেজি উভয় ভাষায় সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান।

এর পাশাপাশি হাসান হাফিজ বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠায় তারা গুরুত্ব দেবে।’

বক্তব্য দিচ্ছেন সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, ‘সাংবাদিকতার ওপরে বিভিন্ন সময় নানা রকম আঘাত ও চাপ আসে। তবে সরাসরি সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা বিরল ঘটনা। সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলার ঘটনার মতো নিকৃষ্ট ঘটনা একটি সমাজে আর হতে পারে না। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংবাদ কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা হলো। বিশ্বের কাছে এটা আমাদের দেশ সম্পর্কে অত্যন্ত খারাপ ধারণা সৃষ্টি করেছে।’

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ আরও বলেন, এই হামলার ঘটনার ইতিহাস ধরে রাখার জন্য প্রথম আলো প্রদর্শনীর মাধ্যমে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক  ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক  ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘এখানে আমরা একটি গণমাধ্যমের কঙ্কাল দেখতে পাচ্ছি। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই কঙ্কালের ভেতর  থেকে প্রাণের প্রকাশ ঘটেছে। প্রদর্শনীতে যেমন দেখানো হয়েছে, আমাদের সাংবাদিক সমাজকেও সেভাবেই জেগে উঠতে হবে। এ জন্য সব ভেদাভেদ ভুলে সাংবাদিকদের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।’ সরকারের প্রতি তিনি সাংবাদিকতার মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বক্তব্য দিচ্ছেন
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান প্রদর্শনীর জন্য শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যমকর্মী এবং প্রথম আলোয় হামলার পর যাঁরা পাশে থেকেছেন, সংহতি প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন—সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘এই প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে শিল্পী ধ্বংসের মধ্যেও একটি গভীর প্রাণশক্তি ও আশাবাদের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমাদের এখন এই আশা ও শক্তিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অনেক বছর ধরে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি, বিরোধ বিরাজ করছিল। কিন্তু অতীতে যা–ই থাক, যা কিছু হোক, সেখানে থেকে উঠে এসে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নিরাপত্তার জন্য নিজেদের ভেতরের ঐক্য শক্তিশালী করতে হবে। আমরা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকব। যদি কারও ওপর কোনো আঘাত আসে, আমরা সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে তার প্রতিবাদ করব। ভবিষ্যতে প্রথম আলো এটা করবে। একই সঙ্গে আমাদের সত্যনিষ্ঠভাবে সাংবাদিকতাও করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সত্যই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’

শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন দর্শকেরা
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, ফটোসাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম মহসীন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হাসান সোহেল, ডিক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিকুল করিম, ফরিদ হোসেন, সৈয়দ আবদাল আহমেদ, জাহিদ নেওয়াজ খান, মাসুদ কামাল, রেজানুর রহমান। জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক রফিকুর রহমান, নাসির আলী মামুনসহ আরও ছিলেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, আজকের পত্রিকা সম্পাদক কামরুল হাসান, এএফপির ব্যুরো চিফ শেখ সাবিহা আলম, রয়টার্সের ব্যুরো চিফ রুমা পাল, এটিএন বাংলার পরিচালক (বার্তা) হাসান আহমদ চৌধুরী কিরণ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনসহ অনেকে।