দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহে ছড়িয়েছে ৫৩টি অপতথ্য

সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও টুপি পরে মসজিদের মিম্বারসদৃশ একটি চেয়ারে বসে বক্তব্য দিচ্ছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলছেন, ‘একটা সমাজে যখন অন্যায় অপকর্ম, অসুর—এই সমস্ত অপকর্মের নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তখন এটাকে দমন করার জন্য আপনাদের দুর্গাদেবী এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেন এবং সেখানেই শুভ শক্তির বিজয় সাধিত হয়েছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, মন্ত্রী মসজিদের মিম্বারে বসে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এই বক্তব্য দিয়েছেন। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্পাদনা করে দুই ঘটনার দৃশ্য ও বক্তব্য একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে লক্ষ্মীপুরের চৌপল্লী বারাহী মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্যটি দেন শহীদউদ্দীন চৌধুরী। এটি তাঁর নির্বাচনী এলাকা। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে মসজিদের মিম্বারে বসে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার অন্য একটি ভিডিওর সঙ্গে পূজামণ্ডপে দেওয়া বক্তব্যের অডিও যুক্ত করে আলোচিত ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।

দেবী দুর্গার বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ২১ অক্টোবর শেষ হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে নানা ধরনের অপতথ্য। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া এসব অপতথ্যে কখনো অন্য দেশের ঘটনা বাংলাদেশের বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। কখনো কখনো পুরোনো ঘটনার সঙ্গে নতুন দাবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আবার সম্পাদিত ফটোকার্ড, ভুয়া পরিচয় ও সাজানো ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে।

১৬ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ৫৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে তিনটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রিউমর স্ক্যানার ৪৩টি, বাংলা ফ্যাক্ট ৭টি ও ডিসমিসল্যাব ৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে।

শনাক্ত হওয়া অপতথ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফেসবুকে ২৫টি এবং এক্সে (সাবেক টুইটার) ১৯টি ছড়িয়েছে। এ ছাড়া ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামসহ একাধিক প্ল্যাটফর্মেও অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে।

অন্য দেশের ভিডিও বাংলাদেশের বলে প্রচার

শনাক্ত হওয়া অপতথ্যগুলোর মধ্যে অন্য দেশের বিভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে বাংলাদেশের দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারের প্রবণতা দেখা গেছে। একটি প্রতিমা রাস্তায় পড়ে থাকার ছবি ও ভিডিও এক্সে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, বরিশালের উজিরপুরে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের সময় ইসলামপন্থীদের হামলায় হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছেন।

যাচাই করে দেখা যায়, ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়, ভারতের। স্বপ্না দাস নামের এক ভারতীয় নারীর প্রোফাইলে মূল ঘটনা নিয়ে একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। তিনি জানান, ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার গাইঘাটায় একটি প্রতিমা গাড়িতে তোলার সময় পড়ে যায়। ভিডিওটি সে সময় ধারণ করা হয়েছিল।

এ ছাড়া ‘জামায়াত নেত্রীর পূজা উদ্‌যাপনের দৃশ্য’ দাবিতে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটিও বাংলাদেশের নয়। ভারতের বারানসিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রচারের অংশ হিসেবে মুসলিম নারীদের দীপাবলি উদ্‌যাপন ও ভগবান রামের আরতিতে অংশ নেওয়ার দৃশ্য এটি। গত বছরের অক্টোবরে ধারণ ভিডিওটি ধারণ করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচারের ঘটনাও দেখা গেছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছবি ব্যবহার করে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘নবী-রাসূল নয়, দেব–দেবীরাই পৃথিবী থেকে অন্যায় দূর করেছেন।’

যাচাই করে দেখা যায়, তিনি এমন মন্তব্য করেননি। দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত ১৮ অক্টোবর ঢাকার রমনা কালীমন্দিরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মূলত বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের শুধু নয়, সমগ্র পৃথিবীতে যখন অন্যায় অত্যাচার নিপীড়ন নির্যাতন নেমে এসেছিল, তখনই দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল।’ বক্তব্যে তিনি অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং তা পরাজিত করাকে পূজার মূল দর্শন হিসেবে তুলে ধরেন।

এ ছাড়া বিরোধীদলীয় উপনেতা ও সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরকে উদ্ধৃত করে প্রচার করা হয়, ‘দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের নয়, এটি আমাদেরও উৎসব।’ ফটোকার্ডে তাঁর নামের সঙ্গে ‘জামায়াত নেতা আবদুল্লাহ তাহের’ উল্লেখ করা হয়। যাচাই করে দেখা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ থেকেও ভুয়া দাবিটির প্রচার নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

পুরোনো ঘটনার ভিডিও দুর্গাপূজার বলে প্রচার

বাংলাদেশের পুরোনো ঘটনার ভিডিওকেও দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত করে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বন্ধের দাবিতে সম্প্রতি মিছিল হয়েছে’—এমন ক্যাপশনে একটি মিছিলের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।

যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের। সে সময় ঢাকার উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ঈদগাহ মাঠে দুর্গাপূজার আয়োজন না করে অন্য স্থানে পূজামণ্ডপ সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে মিছিল হয়েছিল। পরে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের রবীন্দ্র সরণিতে (মুগ্ধ চত্বর) দুর্গাপূজার আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। সেখানেই পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এক্সে প্রচার হওয়া আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, ঢাকায় বিএনপির এক নেতার ছেলে প্রকাশ্যে এক হিন্দু নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করেছেন। ওই নেতাকে ‘বড়াইখালি ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রো’-এর মালিক বলেও উল্লেখ করা হয়।

যাচাই করে দেখা যায়, ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। ভিডিওটি গত বছর ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুতুবা ইউনিয়নের ছাগলা গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক দম্পতির পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মারধরের ঘটনার।

ভুয়া প্রোফাইল থেকে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা

দুর্গাপূজার মণ্ডপে মুসলিম দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজ থেকে। ‘পূজামণ্ডপে হিন্দুদের চেয়ে মুসলিম দর্শনার্থীই বেশি! দাড়ি-টুপি পরে কেউ কেউ এমন আচরণ করেন, যা খুব বিব্রতবোধ লাগে। আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আপনারা কেন আসেন?’ ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে পোস্টটি প্রকাশ করা হয়। এটি ধরে নিয়ে অনেকে সমালোচনাও করেন।

যাচাই করে দেখা যায়, পেজটি গত ১৯ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়। মাত্র এক মাসের মধ্যে এতে প্রায় ১০ হাজার অনুসারী যুক্ত হন। পেজের পরিচিতিতে বলা হয়েছে, সিমা চক্রবর্তী সিলেটের বাসিন্দা এবং দিরাই উচ্চবিদ্যালয় ও দিরাই ডিগ্রি কলেজে (বর্তমান দিরাই সরকারি কলেজ) পড়াশোনা করেছেন।

তবে যাচাই করে দেখা যায়, পেজটিতে ব্যবহৃত নারীর ছবি সিমা চক্রবর্তীর নয়। তিনি বাংলাদেশেরও নন। মূলত ভারতীয় নারী নিতু যাদবের ছবি এবং তাঁর স্বামী ও সন্তানের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে সামান্য সম্পাদনা করে ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামের পেজটি পরিচালনা করা হচ্ছে।

সাজানো ভিডিওর খণ্ডিত অংশকে বাস্তব ঘটনা বলে প্রচার

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাজানো ভিডিওর অংশবিশেষকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচারের ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। একটি ভিডিওতে মন্দিরের সিঁড়িতে পূজা দিতে আসা কয়েকজন নারীকে বাধা দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘নিম্ন বর্ণের হিন্দু মহিলার সাথে উচ্চ বর্ণের মহিলার ধাক্কা লাগছে তাই মন্দির থেকে বের করে দিছে নিম্ন হিন্দু মহিলাকে। এটাই ওদের ধর্ম।’

যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি একটি ইউটিউব ব্লগের অংশ। ভারতীয় প্রোফাইল সোনালি নাগের কাছে পুরো ভিডিওটি পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনের সূত্র ধরে পিংকি ধিবার অফিশিয়াল নামের ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ইউটিউব চ্যানেলে পুরো ভিডিওটি পাওয়া যায়। এতে ১৯২৬ সালের একটি ঘটনার দৃশ্যায়ন হিসেবে ওই অংশ তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ সাজানো ভিডিওর খণ্ডিত অংশকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

আরেকটি ভিডিওতে হুইলচেয়ারে বসা এক বৃদ্ধকে কয়েকজন যুবকের মারধরের দৃশ্য দেখিয়ে দাবি করা হয়, ‘ভারতে শতায়ু বৃদ্ধকে নির্মম নির্যাতন করছে হিন্দু চরমপন্থীরা’। যাচাই করে দেখা যায়, এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ভিডিও নয়। ভারতের একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের তৈরি চিত্রনাট্যভিত্তিক ভিডিও এটি। গত ডিসেম্বরে ইউটিউবে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।