আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সেনাবাহিনীর ধাওয়ার ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

কোলাজপ্রথম আলো গ্রাফিকস

ফুটবল বিশ্বকাপে মাতোয়ারা এখন গোটা বিশ্ব। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিল–সমর্থকদের মিছিলের খবর প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মিছিল সেনাবাহিনীর ধাওয়ার মুখে পড়েছে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, এই ছবি আসল নয়।

‘আর্জেন্টিনার পতাকা নিয়ে রাস্তায় মিছিল করার কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ধাওয়া করেছে এবং এতে অন্তত ১০ জন সমর্থক আহত হয়েছেন’—এ দাবি করে কয়েকটি পোস্ট এসেছে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে। তাতে যুক্ত ছবিতে দেখা যায়, নীল-সাদা জার্সি পরা কয়েকজন আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন এবং সেনাসদস্যরা তাদের ধাওয়া করছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক,

ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে কোনো নির্ভরযোগ্য বা স্বীকৃত সংবাদমাধ্যম কিংবা উৎসে এর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গুগলের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির তথ্যানুযায়ী, আলোচিত ছবিটি গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদনা বা তৈরি করা হয়েছে। এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশনে পাওয়া যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৮ শতাংশ।

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

যাচাই করতে গিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রায় একই ছবি পাওয়া যায়। ছবিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আলোচিত ছবিটির সঙ্গে ওই ছবির পারিপার্শ্বিক মিল থাকলেও আইভীর গায়ে জার্সি নয়, বরং ছিল শাড়ি।

লিংক: এখানে

অর্থাৎ ঢাকা ট্রিবিউনের তোলা এই ছবিকে সম্পাদনার মাধ্যমে আইভীর গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবিটি সিন্থ আইডি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদিত।

ইরানের পতাকা নিয়ে বাংলাদেশে মিছিলের একটি ছবিও ছড়িয়েছে দেশটি ১৬ জুন বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করার পর।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন কোনো ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ছবিটি পর্যবেক্ষণ করলে এতে প্রদর্শিত মানুষের অঙ্গভঙ্গি ও পারিপার্শ্বিক সামগ্রিক অবস্থায় অসামঞ্জস্যতা লক্ষ করা যায়, যা সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে দেখা যায়। আরও যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি এআই দিয়ে তৈরি।

ইরান ফুটবল দলের কয়েকজন খেলোয়াড় মাঠে পবিত্র কোরআন শরিফের সামনে সিজদা করছেন—এমন একটি ছবিও ছড়িয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটিও এআই দিয়ে তৈরি।

এআই ভিডিও ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এক নারীর স্টেডিয়ামে বসে থাকার একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ‘ম্যাচ চলাকালে মায়াবী কালো মেয়ের মায়ায় পড়লেন দর্শকরা’—এমন ক্যাপশনে ডেইলি নিরপেক্ষ নামের একটি পেজে পোস্ট করা ভিডিও ১৩ লাখ বার দেখা হয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

অনুসন্ধানে ‘jeyla_shore’ ইউজারনেমের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গত ৩১ মে মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। সেখানে ওই নারীর আরও ভিডিও রয়েছে। একই নামের টিকটক অ্যাকাউন্টে একই নারীর আরও ভিডিও পাওয়া যায়। টিকটক অ্যাকাউন্টটির বায়োতে লেখা আছে, জেইলা শোরে একজন ভার্চ্যুয়াল ইনফ্লুয়েন্সার এবং ‘aceaispark.com’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।

ওয়েবসাইটটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এটি এআইভিত্তিক কনটেন্ট জেনারেশন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে টেক্সট প্রম্পটের মাধ্যমে ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা যায়।

ভিডিওটি এআই কনটেন্ট যাচাইকারী প্ল্যাটফর্ম ‘ডিটেক্ট ভিডিও এআই’–এ যাচাই করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ।

গত ১৪ জুন ব্রাজিল ও মরক্কোর ম্যাচের সময় ‘ব্রাজিল ও মরক্কোর ম্যাচে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ২ তরুণীর তুমুল মারামারি ক্যাপশনে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

ভিডিওর পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করে দাবির পক্ষে কোনো তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি। ফিফা বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে গ্যালারিতে এমন মারামারির খবর জাতীয়-আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।

ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শুরুতে মরক্কোর জার্সি পরা তরুণীর জার্সির পেছনে ‘১০’ লেখা থাকলেও পরবর্তী দৃশ্যে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘A’ হয়ে যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন দৃশ্যে ব্রাজিলের জার্সি পরিহিত তরুণীর মুখাবয়বের গঠন এবং মরক্কোর জার্সি পরা তরুণীর চুল বাঁধার ধরনে অসংগতি লক্ষ করা যায়। এ ধরনের হঠাৎ পরিবর্তন ও দৃশ্যগত অসামঞ্জস্য সাধারণত এআই-নির্মিত ভিডিওর বৈশিষ্ট্য।

এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলে পরীক্ষায় দেখা যায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ।