তিন ধরনের ‘বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে সরকার, দৃশ্যমান উন্নতি নেই: হোসেন জিল্লুর
বর্তমান সরকার তিন ধরনের ‘বোঝা’ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, সরকারকে উত্তরাধিকারের সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা এবং জনপ্রত্যাশা পূরণে দলীয় প্রতিশ্রুতি—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামাল দিয়ে এগোতে হচ্ছে।
আজ শনিবার দুপুরে ‘নতুন সরকারের ৩ মাস: একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এ কথা বলেন হোসেন জিল্লুর রহমান। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিত এই আলোচনার আয়োজন করে পিপিআরসি।
উত্তরাধিকারের বোঝার বিষয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক ক্ষত গভীর হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কার্যসম্পাদনে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ছিল। ফলে নতুন সরকারের ওপর উত্তরাধিকারের বোঝা বেড়েছে।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপরও পড়ছে। আর সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন সরকার দীর্ঘ সময় নিয়ে ইশতেহার তৈরি করেছে। সেখানে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নামে একটি দর্শনের কথা বলা হয়েছে। তবে সেই দর্শন বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির বাস্তবতা এখনো তৈরি হয়নি। বিচারহীনতার সংস্কৃতিও রয়ে গেছে। স্বাধীন বিচারব্যবস্থার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির ঘটনায় ‘মিশ্র সংকেত’ পাওয়া যাচ্ছে। এর পরিবর্তে সরকার কী কাঠামো আনছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের নাগরিক আলোচনাকে আবেগনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও গঠনমূলক জনসম্পৃক্ততার দিকে নিতে হবে বলে সাবেক এই উপদেষ্টা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নেতিবাচক উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ‘ট্যাগ’ দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন।
নির্বাচিত সরকার সফল হলে তা দেশের সব নাগরিকের জন্যই ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে উন্নত করার দায়িত্ব সবার। জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা শুধু রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব নয়; আলোচনার মাধ্যমে নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়িক অংশীজনদেরও সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করা এবং সরকারের ওপর প্রমাণভিত্তিক জবাবদিহির চাপ তৈরি করতে হবে।
দেশ কোন দিকে যাচ্ছে বা যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—এর সার্বিক চিত্র বোঝার জন্য সরকারকে আরও কিছু সময় দেওয়ার পক্ষে তিনি।
ওয়েবিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর মানুষের মধ্যে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিমুক্তকরণ, আইনশৃঙ্খলা সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অবস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতি অসম রয়ে গেছে।
ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ভূরাজনৈতিক কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বর্তমান সরকারের সামনে। ক্ষমতায় আসার আগে রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত হত্যা, পানির ইস্যুতে সরকারের নীতি কী হবে, সেটির উল্লেখ থাকা দরকার ছিল। তিন মাস সময় খুব বেশি নয়, তবে নিরাপত্তা খাতে সরকারের অগ্রাধিকারের চিত্র তুলে ধরা উচিত ছিল। এখনো সরকার সেটি জানাতে পারে।
আগের সরকারের ওপর দোষ চাপানোর প্রবণতা
এদিকে গত তিন মাসে আগের সরকারের ওপর দোষ চাপানোর প্রবণতা দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান। তিনি বলেন, এই দোষারোপের মাধ্যমে সরকার কাজ না করার অজুহাত খুঁজছে। তাঁর মতে, বর্তমান সরকারের মূল সংকট ম্যান্ডেটের নয়; তাদের সক্ষমতা ও বাস্তবায়নের দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, সরকার একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় বিশ্বজুড়ে ক্রেতারা চাপে পড়েছেন। ভোক্তারা বাজেট কাঁটছাট করছেন। তিনি বলেন বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে আরও তিন মাস সময় দেওয়া উচিত।
আগামী বাজেট নিয়ে ফজলুল হক বলেন, বর্তমান সরকার যদি সংকোচনমূলক বাজেট দেয়, সেটি সাহসী পদক্ষেপ হবে। সরকারের ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। দেনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আবার ঋণ নিতে হবে।
বিভিন্ন আঙ্গিকে মব চলছে
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন,অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব ভায়োলেন্সের আশঙ্কা ছিল, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন মব ভায়োলেন্সকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না; এরপরও বিভিন্ন আঙ্গিকে সেটি চলছে। সরকারেরও শক্ত অবস্থানের নমুনা দেখা যাচ্ছে না।
পুলিশের সংস্কারের কথা বলা হলেও কিছুই হয়নি বলে অভিযোগ করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, পুলিশের মনোবল এখনো সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের মধ্যে দুর্বলতা থাকলে সেটি সংশোধন করে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার জন্য সচিবালয় দরকার ছিল বলে তিনি মনে করেন।
আলোচকেরা কঠিন প্রেক্ষাপটে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা স্বীকার করলেও আসন্ন মাসগুলোতে দোষারোপের রাজনীতি থেকে সরে এসে ব্যবহারিক সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, মেধাতন্ত্র এবং শক্তিশালী নীতি–নির্দেশনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন।