শুধু আশ্বাস নয়, নেতাদের কাজ দেখতে চায় মানুষ

পরবর্তী সরকারের কাছে ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা উঠে এসেছে নাগরিক ইশতেহারে।

‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রেছবি: তানভীর আহাম্মেদ

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আশ্বাসে মানুষ আর আগের মতো বিশ্বাস রাখতে পারছে না বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, যারাই নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসতে চাইছে, তাদের এ বিষয়ে ভালোভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ, মানুষ এখন একটু অধৈর্য হয়ে আছে। শুধু আশ্বাসে অত বিশ্বাস করতে চাইছে না, মানুষকে দৃশ্যমান কিছু কাজ দেখাতে হবে।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে বক্তব্য দেন অধ্যাপক রওনক জাহান। এর আয়োজক ছিল এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। রাজনীতিবিদ, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নেন। এ আয়োজনের শুরুতে দেশের ৩৫টি জেলার প্রায় দেড় হাজার স্থানীয় অংশীজন ও তরুণের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা নাগরিক ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।

সংলাপে নাগরিক ইশতেহারের ওপর ‘বিশেষ মন্তব্য’ করেন অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকদের ধারণা ও প্রত্যাশা সাংঘর্ষিক হয়। ‘স্টেট অব ডেমোক্রেসি’ নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছিল। সেখানে এক প্রশ্নের উত্তরে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা সব থেকে বেশি। আবার কাদের শাসন বেশি ভালো—এমন প্রশ্নে মানুষ বেশি ভোট দিয়েছিল, সেনাশাসনের পক্ষে। অর্থাৎ একই লোক একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলছে, অন্যদিকে আরেক প্রশ্নে সেনাশাসনকে ভালো মনে করছে। এতে বুঝা যায়, মানুষের প্রত্যাশার ক্ষেত্রে বৈপরীত্য আছে।

‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে অধ্যাপক রওনক জাহান। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে
ছবি: প্রথম আলো

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, যারা হেরে যায়, তারা নানাভাবে নির্বাচনকে বিতর্কিত করে। আগামী নির্বাচনের জন্যও বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যারা আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে, তাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের প্রত্যাশা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে কতটা সময় তারা অপেক্ষা করতে রাজি, সেটি বোঝাই আগামী নির্বাচনে দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

মানুষ এখন একটু অধৈর্য হয়ে আছে। শুধু আশ্বাসে মানুষ অত বিশ্বাস করতে চাইছে না।
অধ্যাপক রওনক জাহান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

‘হানিমুন পিরিয়ড সিনড্রোম’

সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, সিপিবি, এনসিপি, গণফোরাম, এবি পার্টি ও বাসদের নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তব্যের মধ্যে তাঁদের রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে
ছবি: প্রথম আলো

সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে এত দিন সেটি অনুপস্থিত ছিল। কারণ, অনির্বাচিত সরকার ছিল।

আমীর খসরুর বক্তব্যের মধ্যেই দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকারগুলো ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষে যখন ব্যর্থ হতে থাকে, তখন আর সমালোচনা নিতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ নেয়।

‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে

আমীর খসরুর কাছে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চান, আগামী দিনে ‘হানিমুন পিরিয়ড সিনড্রোম’ থাকবে না—এমন নিশ্চয়তা কীভাবে পাওয়া যাবে।

এর জবাবে আমীর খসরু বলেন, রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা ফেরাতে রাজনীতিবিদদেরই কাজ করতে হবে। তা ছাড়া দেশের মানুষের মনোজগতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা যেসব রাজনৈতিক দল ধারণ করতে পারবে না, তাদের রাজনীতিতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা ফেরাতে রাজনীতিবিদদেরই কাজ করতে হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সদস্য, স্থায়ী কমিটি, বিএনপি

নারীদের মনোনয়ন না দেওয়ায় প্রশ্ন

সংলাপে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা–১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান। দলের নির্বাচনী ইশতেহারে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পাবে, তা তুলে ধরেন তিনি। এ সময় তাঁর কাছে নারীদের মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

এ সময় মঞ্চে থাকা বিএনপির নেতা আমীর খসরুর দিকে তাকিয়ে সাইফুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একা পিছিয়ে আছি, তা নয়। আমাদের বড় দলও পিছিয়ে আছে। আমরা একসঙ্গে এগোব ইনশা আল্লাহ।’

সাইফুল আলমের এমন মন্তব্যের পর মঞ্চের সামনে দর্শকসারিতে থাকা অনেকে বলেন, ‘আপনারা কাউকেই মনোনয়ন দেননি’। তখন তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু লোকাল নির্বাচনে মেয়েদের অংশগ্রহণ করিয়েছি। এবং তারা নির্বাচিত হয়েছে, তারা কাজ করেছে। আপনারা দোয়া করেন, জাতীয় সংসদেও আমরা নিয়ে আসব।’

‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে উপস্থিত দর্শকেরা। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে
ছবি: প্রথম আলো

এ সময় দর্শকসারি থেকে প্রশ্ন আসে, ‘সেটা কবে?’ এর জবাবে সাইফুল আলম হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রসঙ্গ টানেন। দর্শকসারি থেকে তখন আবারও নারীদের মনোনয়নের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এরপর সাইফুল আলম বলেন, ‘আমি আপনাদের সাথে একমত। আমাদের আপনারা সুযোগ দেন। ইনশা আল্লাহ নারীরা আসবে সামনে।’

সরকারগুলো হানিমুন পিরিয়ড শেষে যখন ব্যর্থ হতে থাকে, তখন আর সমালোচনা নিতে পারে না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আহ্বায়ক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম

জবাবদিহি কাঠামো ও গণভোট

সংলাপে অতিথির বক্তব্যে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, রাজনীতিবিদেরা শুধু সুবচন দিয়েছেন। কোনো দলই নির্বাচনের পরে আর কথা রাখেনি। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের ওপর জোর দেন তিনি।

সংলাপে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফীর কাছে গণভোট নিয়ে দলটির দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এর জবাবে তিনি বলেন, সিপিবি জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি। কারণ, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি সংরক্ষণের নিশ্চয়তা ছিল না। তাঁরা বর্তমান গণভোটকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন।

নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে পুরোনো বন্দোবস্তে ঢুকে পড়ায় সংলাপে ক্ষমা চান এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। মঞ্চের সামনে বসা এ সংলাপের আলোচনা শুনতে আসা অতিথিদের কাছে তিনি জানতে চান তাঁর ক্ষমা গৃহীত হয়েছে কি না। জবাব আসে ‘না’। তখন তিনি হেসে বলেন, ‘ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করতে হয়।’

মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা পুরোনো কাঠামোতে ফেরত যেতে চায় না।
তাসনিম জারা, স্বতন্ত্র প্রার্থী, ঢাকা-৯ আসন

পরে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থার স্রোত এবং নির্বাচন নতুন রাজনৈতিক দলগুলকে প্রত্যাশার জায়গায় দাঁড়াতে দেয়নি।

রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য গণতান্ত্রিক জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করার কথা বলেন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসনিম জারা। তাঁর কাছে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চান, নতুন বন্দোবস্তের জন্য সংগ্রাম করার পর এখন কী মনে হচ্ছে।

‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে তাসনিম জারা। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে

জবাবে তাসনিম জারা বলেন, সংগ্রাম তো চলছে। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা পুরোনো কাঠামোতে ফেরত যেতে চায় না। মানুষের প্রত্যাশা ও বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে যে দূরত্ব, সেটি দূর করাই এখন মানুষের মূল চাওয়া।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম।

নাগরিক ইশতেহার

সংলাপে উপস্থাপন করা নাগরিক ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নাগরিকদের মূল প্রত্যাশা, ভীতিমুক্ত পরিবেশে বিশ্বাসযোগ্য ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। পরবর্তী সরকারের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা হলো ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

এ সংলাপ অনুষ্ঠানে দর্শকসারিতে ছিলেন সিপিডির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক রেহমান সোবহান, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানসহ অনেকে।