অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন নেওয়া ৩ মাস ধরে বন্ধ

তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধন বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে সেবাপ্রত্যাশীদের ছুটতে হচ্ছে নিবন্ধকের কার্যালয়ে।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশটছবি: ওয়েবসাইট থেকে

ঢাকায় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের কাজে যুক্ত শিউলী আকতার। তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এখন মৃত্যুনিবন্ধন করতে হবে। তবে সে জন্য তাঁকে যেতে হচ্ছে পৈতৃক এলাকায়। কারণ, অনলাইনে মৃত্যুর আবেদন করা যাচ্ছে না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঢাকায় থাকলেও পৈতৃক বাড়ি রাজশাহীতে। ফলে মায়ের মৃত্যুনিবন্ধন সেখান থেকে করতে হবে। সে জন্য তিনি রাজশাহী যাবেন।

গত নভেম্বর থেকেই মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন করতে না পারার কথা জানিয়েছেন আবুল হাসান নামের এক ব্যক্তি। তিনি প্রথম আলোকে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, সিস্টেমের বেশ কিছু লিংকে প্রবেশ করে কাজ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে নতুন মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন করা যাচ্ছে না। মৃত্যুনিবন্ধন আবেদন প্রিন্ট করা যাচ্ছে না। মৃত্যুনিবন্ধন সনদ পুনর্মুদ্রণও করা যাচ্ছে না। বিষয়টি তিনি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের প্রতিটি দপ্তরে ই–মেইল করে জানিয়েছেন; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

জন্মনিবন্ধনে সমস্যা না হলেও তিন মাস ধরে অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন করা যাচ্ছে না। নিরাপত্তার কারণে তা বন্ধ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে।

এর আগে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন অনলাইনেই করা যেত। আবেদন করার পর তার অনুলিপি নিয়ে নিবন্ধন কার্যালয়ে যেতেন সেবাপ্রত্যাশীরা। কার্যালয় থেকে হাতে পেতেন নিবন্ধনের সনদ। জন্মনিবন্ধনে সমস্যা না হলেও তিন মাস ধরে অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন করা যাচ্ছে না। নিরাপত্তার কারণে তা বন্ধ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে। তবে এতে শিউলী আকতারের মতো অনেককে নিবন্ধন কার্যালয়ে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

সরকারি ভাতাসহ উত্তরাধিকার, পারিবারিক সম্পত্তির বণ্টন, পেনশন প্রাপ্তি, জমিজমা বা সম্পত্তির নামজারিসহ নানা প্রয়োজনে মৃত্যু নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন। কোনো মৃত ব্যক্তির যদি জন্মনিবন্ধন না থাকে, তাহলে তার মৃত্যুর পর মৃত্যুনিবন্ধন করার আগে জন্মনিবন্ধন করিয়ে নিতে হয়।

জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করলে কোনো ফি লাগে না। ৪৫ দিন থেকে ৫ বছরের মধ্যে করলে ২৫ টাকা এবং ৫ বছর পর করালে ৫০ টাকা ফি লাগে। তথ্য সংশোধনের জন্য ১০০ টাকা লাগে। অনলাইনে আবেদন করার পর নিবন্ধকের কাছ থেকে সনদ নিতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা ইউপি সচিব সহকারী নিবন্ধক আর ইউপি চেয়ারম্যান নিবন্ধক। সিটি করপোরেশন এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে নিবন্ধন করাতে হয়।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা হয় সরকারি এই ওয়েবসাইটে (https://bdris.gov.bd/)। এখন সেখানে আবেদন করতে গেলে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড চাওয়া হচ্ছে, যা নিবন্ধক ও সহকারী নিবন্ধকের কাছে থাকে।

মৃত্যুনিবন্ধন ঘিরে একটি চক্র ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে বলে খবর পাওয়ার পর গত বছরের ২১ নভেম্বর আবেদন নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নিরাপত্তার কারণ

অনলাইনে মৃত্যুনিবন্ধন আবেদন কেন বন্ধ রয়েছে—জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার জেনারেলের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্বে থাকা আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি অল্প কিছুদিন হলো এ কার্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য দিতে পারছেন না।

রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপত্তার কারণে অনলাইনে শুধু মৃত্যুনিবন্ধন বন্ধ রাখা হয়েছে। মৃত্যুনিবন্ধন ঘিরে একটি চক্র ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে বলে খবর পাওয়ার পর গত বছরের ২১ নভেম্বর আবেদন নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মারা গেছেন এমন ব্যক্তির যদি আগে থেকে জন্মনিবন্ধন করা না থাকে, তাহলে মৃত্যুনিবন্ধনের আগে ওই ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন করতে হয়। কিছু ব্যক্তির হাতে সেসব তথ্য চলে যায় এবং তারা অর্থের বিনিময়ে সেসব তথ্য ব্যবহার করেছে। এটা জানার পর সিস্টেমে কিছু ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে মৃত্যুনিবন্ধনের নতুন আবেদন, মৃত্যুসনদ প্রিন্ট, মৃত্যুসনদ পুনর্মুদ্রণ।

রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন অনলাইনে নেওয়া বন্ধ থাকলেও নিবন্ধন কার্যালয়ে এসে যে কেউ আবেদন করতে পারছেন।

কবে নাগাদ এগুলো খুলে দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যুনিবন্ধনের নতুন আবেদন অনলাইনে খুলে দেওয়া হতে পারে। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে আবেদনের সঙ্গে মুঠোফোন নম্বর সংযুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাতে কোনো তথ্য যাচাই করতে হলে নির্ধারিত ব্যক্তির মুঠোফোন নম্বরে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) যাবে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদন অনলাইনে নেওয়া বন্ধ থাকলেও নিবন্ধন কার্যালয়ে এসে যে কেউ আবেদন করতে পারছেন। ওয়েবসাইটে দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুসারে, ২৯ জানুয়ারি সারা দেশে ৪ হাজার ২১০টি মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে। তার মধ্যে মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধনের আবেদন ছিল ৩৬টি।