জুলাই কারাবন্দীরা শোনালেন বর্বর নির্যাতনের ঘটনা

‘জুলাই কারাবন্দীদের স্মৃতি’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। ঢাকা, ০৬ আগস্টছবি: প্রথম আলো

জুলাই আন্দোলনে আটকের পরই শুরু হতো নির্যাতন। থানাহাজতে নিয়ে দফায় দফায় নির্যাতন করা হতো। রিমান্ডে এনেও করা হতো আরও ভয়ংকর নির্যাতন। অসুস্থ হলেও কোনো চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখা হতো হাজতে। খাবার চাইলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হতো। কারাগারে গিয়েও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পাননি আন্দোলনকারীরা। জুলাই আন্দোলনের মাঠ থেকে আটকের পর যে নির্যাতন শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয় গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর।

বুধবার রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘জুলাই কারাবন্দীদের স্মৃতি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীরা। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ ও রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও সে সময়ের নির্যাতনের স্মৃতিচারণা করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ঢাকা, ০৬ আগস্ট
ছবি: প্রথম আলো

জুলাই কারাবন্দীরা বলেন, ‘আন্দোলনে নেমে ছাত্রলীগ, যুবলীগের হাতে মার খেয়েছি। আটকের পর পুলিশ নির্যাতন করেছে। কারাগারে গিয়েও রক্ষা পাইনি। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন না হলে হয়তো বাকি জীবন জেলে কাটাতে হতো।’ কারও জীবনে যেন এমন দুঃসহ স্মৃতি ফিরে না আসে, সেই কামনা করেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও চেয়েছেন তাঁরা। জুলাই আন্দোলনে গিয়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তালিকা করে সরকারের কাছে একটি গেজেট প্রকাশের দাবি জানান তাঁরা। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছিল, সেগুলো প্রত্যাহারের দাবি এবং কারাবন্দীরা তাঁদের স্মৃতিচারণায় কারাগারের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরে সংস্কারের দাবি জানান।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন গণ–অভ্যুত্থানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা। মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই মিলনায়তন ভরে যায়। কারাগারে একসঙ্গে কাটানোর নানা স্মৃতিচারণা করেন তাঁরা। কারাগারে একই সেলে বন্দী ছিলেন এমন ব্যক্তিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।

অনুষ্ঠানে জুলাইয়ের স্মৃতিচারণা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। ঢাকা, ০৬ আগস্ট
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠানের শুরুতেই নির্যাতনের বর্ণনা দেন ঢাকার একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মো. মাহদি হাসান। তিনি ১৯ জুলাই মতিঝিল থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। মাহদি হাসান বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর থানার সামনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা–কর্মীরা রামদা নিয়ে মারতে আসেন। তখন পুলিশ সদস্যরা তাঁদের বলেন, এই জঙ্গিকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা থানায় আসেন। তখন আমি অবাক হয়ে যাই। পুলিশ সদস্যরা আমাকে মারতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে থানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।’

ঢাকার যেসব স্থানে বড় আন্দোলন হয়েছিল, তার একটি ছিল উত্তরা। উত্তরা পূর্ব থানার বিপরীত পাশে ১৬ জুলাই অবরোধ কর্মসূচিতে যোগ দেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুকুট মিয়া। আটক হন ১৮ জুলাই। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। পুলিশ ওই বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে তিনি বেরিয়ে আসেন। পুলিশ তাঁকে আটক করে।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা, ০৬ আগস্ট
ছবি: প্রথম আলো

মুকুট মিয়া বলেন, দুই দিন থানায় আটক রেখে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পুলিশের নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কোনো চিকিৎসা ও খাবার না দিয়ে পুলিশ তাঁকে আবার নির্যাতন করে।

অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাঁরা বলেন, জীবনে অনেকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে জুলাইয়ে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে, তা নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেন না। কারাগারে যাওয়ার পর কারারক্ষীরা তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। অথচ শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সেই কারারক্ষীরা তাঁদের ‘স্যার’ বলে ডাকা শুরু করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রমুখ।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন গণ–অভ্যুত্থানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা। ঢাকা, ০৬ আগস্ট
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, কোনোভাবেই শেখ হাসিনার পতন হতো না, যদি তরুণ–তরুণী ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত না হতেন। চোখের সামনে মরতে দেখেও জীবনের মায়া না করে রাস্তায় নেমেছেন। সে জন্যই হাসিনার পতন হয়েছে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, তখন দেশ তো দেশ ছিল না। পুরো দেশটাই ছিল একটা কারাগার।

জুলাইকে মনে ধারণ করে নিজেদের মধ্যে থাকা বিভেদ ভুলে সব রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুরোধ করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, জুলাই কারাবন্দীদের তালিকা করা হবে। সেই তালিকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সংরক্ষণ করে রাখা হবে। পাশাপাশি কারাবিধি সংস্কার করার কথা বলেন তিনি।