দেশে প্রাণি থেকে মানুষে রোগ বাড়ছে

জলবায়ু পরিবর্তন ও ভাইরাসের চরিত্র বদলের কারণে রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় অভিন্ন স্বাস্থ্য পদ্ধতিতে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ ৭ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। ২০২৬ সালের এই দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক জোরালো আহ্বান নিয়ে হাজির হয়েছে, ‘বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একাত্মতা’। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং আমাদের এই গ্রহের স্বাস্থ্য যে একসূত্রে গাঁথা, সেই বৈজ্ঞানিক সত্যকে সামনে রেখেই এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবং প্রাণিবাহিত রোগের প্রকোপে জনস্বাস্থ্য নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন বিজ্ঞানের ওপর ভরসা আর সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ।

পরিবেশ ও প্রাণীর স্বাস্থ্যেই মানুষের সুরক্ষা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রাণী থেকে মানুষের দেহে রোগ ছড়ানোর (জুনোটিক ডিজিজ) প্রবণতা বাড়ছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দীর্ঘ এক দশক পর বার্ড ফ্লুতে এক শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। আইইডিসিআর-এর তথ্যমতে, গত দুই বছরেই দেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর অর্ধেক সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। কেবল বার্ড ফ্লু নয়, নিপাহ ভাইরাস, অ্যানথ্রাক্স কিংবা মশাবাহিত ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার বিস্তারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন স্বীকার করেন, ‘অনেক দিন পর মৃত্যু হলেও সংক্রমণ যে বাড়ছে, সেটা উদ্বেগজনক।’

গবেষণা বলছে, মানুষের শরীরে থাকা রোগজীবাণুর প্রায় ৬১ শতাংশই জেনেটিক। অর্থাৎ পরিবেশ ও প্রাণিজগৎ নিরাপদ না থাকলে মানুষও নিরাপদ থাকতে পারবে না। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, শহর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলেই এই ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে লাইভ বার্ড মার্কেট বা জীবন্ত পাখির বাজারগুলো এখন ‘বায়োলজিক্যাল রিঅ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ভাইরাসগুলো নিজেদের পরিবর্তন করে মানুষের দেহে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করছে।

এ গবেষণার নেতৃত্ব দেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি ও রেডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. তুহিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দিন দিন দেশে প্রাণী থেকে মানুষের দেহে রোগের বিস্তার বাড়ছে। আর এটা গ্রাম ও শহর, সব স্থানেই ঘটছে।

নিপাহ ও জলবায়ুর নতুন বার্তা

নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ এখন আর কেবল শীতকালীন সংকটে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো আগস্টের গরমেও নিপাহ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আইইডিসিআরের মতে, এটি ভাইরাসের চরিত্র বদলের এক বিপৎসংকেত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বন উজাড়ের কারণে বন্য প্রাণী ও বাদুড় মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রধান ব্যাকটেরিয়াজনিত জুনোটিক রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা (টিউবারকিউলোসিস), ব্রুসেলোসিস, সালমোনেলোসিস, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টেরিওসিস এবং লেপ্টোস্পাইরোসিস।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: এক নীরব মহামারি

বাংলাদেশের পোলট্রি ও গবাদিপশু খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে মুরগির মাংসের প্রায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ নমুনায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১০ গুণ বেশি অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর), যা ভবিষ্যতে সাধারণ রোগের চিকিৎসাকেও অসম্ভব করে তুলতে পারে। এই নীরব মহামারি রুখতে বিজ্ঞানভিত্তিক তদারকি ও কঠোর নজরদারির কোনো বিকল্প নেই।

সমাধানের পথ: ‘ওয়ান হেলথ’ ও সমন্বিত উদ্যোগ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বছরের দিবসটি একটি বছরব্যাপী প্রচারাভিযানের সূচনা করছে। যা মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং এই গ্রহের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার শক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। এই প্রচারাভিযানটি ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির ওপর জোরালো মনোযোগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সাফল্য এবং প্রমাণকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা—উভয়কেই তুলে ধরে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে সরকারের নীতিমালা তৈরির সঙ্গে পরামর্শক হিসেবে ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়ান হেলথ পদ্ধতি একটি ভালো উদ্যোগ। আমাদের কাছে পরিকল্পনা আছে, কিন্তু মাঠে তার প্রতিফলন যথাযথ হচ্ছে  না। এর কার্যকারিতার দিকে জোর দেওয়া দরকার।’  

বিজ্ঞানের পাশে দাঁড়িয়ে আগামীর প্রস্তুতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এবারের বার্তাটি স্পষ্ট—বিজ্ঞান আমাদের যে প্রমাণ দিচ্ছে, তাকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। খেজুরের রস পানের সতর্কতা থেকে শুরু করে বাজারে গ্লাভস ও মাস্কের ব্যবহার, কিংবা গবাদিপশুতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই হতে হবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে।