‘এইমাত্র পাওয়া খবর, গ্রেফতার হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা’—এমন ক্যাপশন দিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে বুম নিয়ে এক প্রতিবেদক বলছেন, ‘দেখুন বাংলাদেশের বিখ্যাত ক্রিকেটার এবং একসময়ের এমপিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।’ এ সময় পেছনে হাতকড়া পরা অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজাকে দুই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে হেঁটে যেতে দেখা যায়।
তবে ভিডিওটি যাচাই করে এতে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। ভিডিওর পেছনে একটি ভবনের দেয়ালে লেখা দেখা যায়, ‘ঢাকা কেন্দ্রায় কারাগার ও সংলগ্ন থানা প্রশাসন ও নিরাপত্তা কেন্দ্র’। অথচ বাস্তবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নামফলকে লেখা রয়েছে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ’। সেখানে ‘সংলগ্ন থানা প্রশাসন ও নিরাপত্তা কেন্দ্র’ নামে কোনো অংশ নেই। এ ছাড়া ‘কেন্দ্রীয়’ শব্দটিও ভুল বানানে লেখা।
ভিডিওটিতে আরও দেখা যায়, হঠাৎ করেই অস্পষ্ট বাংলা অক্ষরে ‘আনিরেডিত্র জ সিানরি কদরা’ ধরনের অর্থহীন লেখা ভেসে ওঠে। ভিডিওতে কথিত প্রতিবেদকের বাচনভঙ্গি, ঠোঁটের নড়াচড়া এবং আশপাশের পরিবেশের মধ্যে অস্বাভাবিক অসামঞ্জস্যও লক্ষ করা যায়।
এ বিষয়গুলোই সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কনটেন্টে থেকে থাকে। ফলে এই ভিডিও নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।
এরপর ভিডিওটি ভালোভাবে দেখলে এর বাঁ পাশের নিচের কোণে ‘Veo’ লেখা একটি চিহ্ন দেখা যায়। ভিডিওতে ‘Veo’ চিহ্ন থাকার অর্থ হলো এটি বাস্তব ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও নয়; গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্ট। ফলে আলোচিত ভিডিওটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
অধিকতর যাচাইয়ের জন্য ভিডিওটি এআই শনাক্তকারী টুল ‘হাইভ মডারেশন’-এ বিশ্লেষণ করা হলে সেটিও ভিডিওটিকে এআইনির্ভর কনটেন্ট হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা দেখায়।
শুধু ভিডিও নয়, একই দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ডও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ‘যমুনা টেলিভিশন’-এর ফটোকার্ডের আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘গ্রেফতার হলেন এমপি মাশরাফি বিন মুর্তজা’। এতে মাশরাফির একটি ছবিও যুক্ত করা হয়।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক, ষষ্ঠ লিংক, সপ্তম লিংক
তবে যাচাই করে দেখা যায়, যমুনা টিভি এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। যমুনা টিভির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করেও এ–সংক্রান্ত কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। বরং তাদের আসল ফটোকার্ডের সঙ্গে ভাইরাল কার্ডটির তুলনা করলে শিরোনামের ফন্ট, ডিজাইন এবং লেখার বিন্যাসে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।
ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবিটি বিশ্লেষণ করেও এর সত্যতার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে ছবিটি গুগলের এআই শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘SynthID’ দিয়ে পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, ছবিটির পুরো অংশ বা বড় একটি অংশ গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া মাশরাফি গ্রেপ্তার হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে। মাশরাফির মতো আলোচিত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেই খবরটি আসাটা স্বাভাবিক ছিল।
মাশরাফি বিন মুর্তজার গ্রেপ্তার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ফটোকার্ডের পোস্টগুলোর মন্তব্যে চোখ রাখলে দেখা যায়, কেউ কেউ খবরটি সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। তবে খবরটি সত্য নয়, এআই দিয়ে তৈরি এ–সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিওগুলো এই বিভ্রান্তি তৈরি করছে।