প্রথম আলোর আয়োজনে ‘বৈধ পথে প্রবাসী আয়: ডিজিটাল মাধ্যমের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এ গোলটেবিল আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক উপপ্রধান মাহফুজুর রহমান বলেন, বৈধ ও অবৈধ পথে ডলারের বিনিময় হারের পার্থক্য বেশি হলে বৈধ পথে আয় পাঠাতে প্রবাসীরা আগ্রহী হবেন না। তা ছাড়া যদি বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্কিম করা যায়, তাহলে বৈধ পথে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সাবেক নির্বাহী পরিচালক লীলা রশিদ বলেন, প্রবাসী আয় আনার ক্ষেত্রে বৈধ ও অবৈধ পথ প্রতিযোগিতা করছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত সেবা, কত দামে ও কতটা গোপনীয়তার সঙ্গে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো গেল, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অবৈধ পথে প্রবাসী আয় এলে ডলার দেশে জমা হয় না। তবে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আনলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কেও সবাইকে সচেতন করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বৈধ কাগজপত্রের অভাবেও বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠাতে পারেন না। এ জন্য দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাজ করতে হবে।

মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) বিকাশের চিফ এক্সটার্নাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শেখ মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বিকাশের গ্রাহকদের কাছে প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৪ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি দৈনিক গড়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা সমপরিমাণের প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশে থাকা এক কোটির বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যেই আছেন অধিকাংশ। কিন্তু মূলত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে সেখান থেকে এমএফএসের মাধ্যমে প্রবাসী আয় কম আসছে। তাই সেখানকার প্রবাসীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বেশি আসবে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈধ পথে প্রবাসী আয় কম আসার কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট উত্তম কুমার সাহা। তিনি বলেন, এক্সচেঞ্জ হাউসের অ্যাপসের মাধ্যমে ঘরে বসেও অর্থ পাঠাতে পারেন প্রবাসীরা। অন্যদিকে দেশে এমএফএসের মাধ্যমে প্রবাসী আয় সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। সেই অর্থ এমএফএস হিসাবে রেখেই ব্যয় করা যায়। তবে তার জন্য সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। অন্যদিকে প্রবাসী আয় পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কোনো সার্ভিস চার্জ নেই।

বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাহিদুল আহসান। তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা চান, বিদেশে বসে অর্থ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন দেশে থাকা তার পরিবারের সদস্য টাকাটি পাবেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।’

ব্যাংক এশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট গোলাম গাফফার ইমতিয়াজ চৌধুরী বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে রেকর্ডসংখ্যক শ্রমিক প্রবাসে গেছেন। গত আগস্টে ২০৪ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে ১৫৪ কোটি ডলার হয়েছে। তার মানে কি প্রবাসী শ্রমিকেরা অর্থ পাঠাচ্ছেন না! তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের সচেতন করতে হবে, তাঁদের অর্থ কার মাধ্যমে আসছে। তাঁদের বোঝাতে হবে, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে ভবিষ্যতে কী কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

বৈধ পথে আয় পাঠাতে প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করতে তাঁদের জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের নতুন স্কিম আনার বিষয়ে জোর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, মোটাদাগে প্রবাসী আয় গ্রহণ করেন গ্রামের নারীরা। ব্যাংকের সেবা নিতে তাঁদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তার তুলনায় এমএফএস কিছুটা সহজ। তাই ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারে নারীদের মধ্যে সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে শক্তিশালী করতে হবে। এটির যাত্রা চমৎকারভাবে শুরু হলেও গতি অনেক কম। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। মূলত তুলনামূলক কম দক্ষ ও কম মজুরিতেই মধ্যপ্রাচ্যে যান শ্রমিকেরা। ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় বাড়াতে হলে ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়াতে হবে।

উন্নয়ন সমুন্বয়ের ইমেরিটাস ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার একটি রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। সেটি বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।

গোলটেবিল আলোচনায় সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে হুন্ডি বন্ধ হবে না। অর্থনৈতিক বিষয় অর্থনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। এ জন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।