জ্বালানি–সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া: জ্বালানিমন্ত্রী
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি–সংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। সরকার সেটা সামাল দিয়েছে। সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে।
‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে জ্বালানি বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি)।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী বলেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়নটা হয়েছে, যেখানে পয়সা বানানো যায় সেখানে। প্রয়োজনীয়তা বুঝে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি বলেই টেকসই উন্নয়ন হয়নি। তাই এলএনজির একটা টার্মিনাল বন্ধে সারা দেশে গ্যাসের হাহাকার পড়ে গেছে। নতুন করে একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্থলভাগেও একটি টার্মিনাল নির্মাণের আলোচনা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল নিয়ে ভীতি তৈরি হয়েছিল উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, কিন্তু সরকার তেলের ঘাটতি হতে দেয়নি। ওই সময় কালোবাজারে তেল বিক্রি হয়েছে। অনলাইনেও তেল বিক্রি করেছে। এরপর তেলের ব্যবসা বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও তেল বিক্রি হবে। এ কারণে একটি নীতিমালা করার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়। এটি হলে সবার জন্যই সুযোগ তৈরি করবে।
জ্বালানি–সংকটে মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ফারাক আছে। জ্বালানির ক্ষেত্রেও তাই। এর দায় সরকারের নয়, এটা বলেও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। জনগণের সরকার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই এটি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে অর্থের জোগান থাকতে হবে, সেটা হাতে নেই। এটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সরকার, ওইভাবেই চালানো হচ্ছে। দেশীয় ও আমদানি মিলে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে। ৩০ থেকে ৩৬ মাসের আগে একটা এলএনজি টার্মিনাল চালু করা কঠিন। আইন মেনে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দুই বছরের মধ্যে এটি করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, দুই থেকে ছয় মাসের মধ্যে জ্বালানি–সংকটের কোনো সমাধান নেই। কয়লার ব্যবহার সর্বোচ্চ করতে হবে। গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভারতের আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে আনা বিদ্যুতের দাম সমঝোতার মাধ্যমে কমানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, অতীতে যেসব ভুলের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, সেগুলো এখন বাস্তব সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ও এলএনজি আমদানি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি সমাধান নয়। কারণ, জ্বালানি–সংকটের পাশাপাশি ডলার–সংকটও রয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়, দেশি গ্যাসের উৎপাদন ক্রমেই কমছে। দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান বাড়িয়ে উৎপাদন অন্তত ২০০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কমাতে হবে। ২০৩০ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৪৬০ কোটি ঘনফুট হতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, এ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ না করা। দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা না বাড়িয়ে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বেসরকারি খাত যেকোনো সংকটে মুনাফা বাড়ায় আর সরকার সুরক্ষা দেয়। তাই ভোক্তারা বেসরকারি খাতের কাছে নিরাপদ নয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফইআরবির চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন এফইআরবির নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ। এতে আরও বক্তব্য দেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী।