প্রধানমন্ত্রীকে সফরে নিতে চায় জাপান, কী হতে পারে
আসন্ন টোকিও সফর দুই দেশের সম্পর্ককে উন্নয়ন সহযোগিতানির্ভর কাঠামো থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করার আরেকটি ধাপ।
গত জুনের চীন সফরের পর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তনে মনোযোগ রয়েছে জাপানের। এরই অংশ হিসেবে মাস দুয়েকের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে টোকিও সফরে নিতে চায় দেশটি। এর আগে আগস্টের প্রথমার্ধে ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবেরা বৈঠক করবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ঢাকা ও টোকিওর কূটনৈতিক সূত্রে এসব জানা গেছে।
ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি গত ২৮ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাপান সফরে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানান। পরে ১ জুলাই বাংলাদেশ সফরে এসেছিল জাপানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শিমাদা তোমাকি তাঁকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানান।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, জাপান এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরে নেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কথা চলছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, তারেক রহমানের আসন্ন টোকিও সফর দুই দেশের সম্পর্ককে উন্নয়ন সহযোগিতানির্ভর কাঠামো থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করার আরেকটি ধাপ। বিশেষ করে তারেক রহমানের গত জুনে চীন সফরের পর টোকিও সফরকে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে অংশীদারত্ব
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে যুক্ত রয়েছে জাপান। গত পাঁচ দশকে দেশটি তাদের বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগিতায় (ওডিএ) সব সময় ওপরের সারিতে রেখেছে বাংলাদেশকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে সম্পর্ক ধাপে ধাপে কৌশলগত উত্তরণের পথে এগিয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে যুক্ত রয়েছে জাপান। দুই দেশের সম্পর্ক ২০২৩ সালে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। এরপর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের টোকিও সফরে রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে দূরপ্রাচ্যের দেশটি। গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই সম্পর্কের নতুন ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
প্রথম মেট্রোরেল, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে যুক্ত রয়েছে জাপান।
কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত
কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরে কোন দেশে যাচ্ছেন, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের বেইজিং সফরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া হয়ে চীনে যান।
এবার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ছিল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। চীনের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ৫১ বছরের ইতিহাসে এবার তৃতীয়বারের মতো যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিসরে যুক্ততার পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের চার বৈশ্বিক উদ্যোগের অন্যতম বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে (গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ–জিডিআই) যুক্ত হয়েছে। তিস্তার বৃহদায়তন উন্নয়ন প্রকল্পে সমীক্ষাসহ কারিগরি কাজে চীন সরকারিভাবে যুক্ততার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থনীতি ও সংযুক্তির বিকাশে মিয়ানমারকে যুক্ত করে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছেন সি চিন পিং।
রাজনৈতিক পরিসরে যুক্ততার পাশাপাশি ব্যবসা, বিনিয়োগ, সংযুক্তি—এ বিষয়গুলোতে চীনের সঙ্গে যুক্ততা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উৎপাদন ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গভীর করতে সরকার মনোযোগ দিচ্ছে, অর্থাৎ এভাবে সরকার এখন চীন ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলগত ভারসাম্য গড়ার পরিকল্পনা করছে।
আগস্টের প্রথমার্ধে ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবেরা বৈঠক করবেন। সেখানে সফরসূচি ও আলোচ্য বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ঘিরে চারটি শক্তি—চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থের বিষয়গুলো ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। চার দেশের প্রতিযোগিতা সীমিত থাকেনি শুধু ভূরাজনীতি বা নিরাপত্তায়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন, সরবরাহশৃঙ্খল, সংযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রতিটি দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য অংশীদারদের উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
চীন অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বিআরআই), অর্থনৈতিক করিডর, উৎপাদনশিল্প, বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চাইছে। অন্যদিকে জাপান অবাধ ও উন্মুক্ত ভারত–প্রশান্ত মহাসাগর (ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক–এফওআইপি) ধারণার আওতায় সরবরাহশৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, উন্নত অবকাঠামো ও শিল্প বিনিয়োগে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আগ্রহ বাংলাদেশের বৃহৎ রপ্তানি বাজার, শ্রমমান, ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘিরে। আর ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদীর পানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চার শক্তির স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হলেও সব ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী নয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতায় থাকলেও ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশই আবার বেইজিংয়ের সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্কে জড়িত। ফলে প্রতিটি দেশই নিজের স্বার্থকে আগে দেখছে। নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে এগিয়ে চলছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রতিটি দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য অংশীদারদের উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
জাপান দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে এই সম্পর্ক বহুমাত্রিক হচ্ছে। এতে সহযোগিতার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবেবিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট আ ন ম মুনীরুজ্জামান
অবকাঠামোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় জাপানের প্রতিনিধিদলের আলোচনায় যে প্রসঙ্গগুলো এসেছিল, তার অন্যতম ছিল অবকাঠামো উন্নয়ন। ওই আলোচনায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, এমআরটির লাইনসমূহ, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ জাইকার অর্থায়নে বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের অগ্রগতির প্রসঙ্গগুলো এসেছিল।
জানা গেছে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজের অগ্রগতি নিয়ে দুই পক্ষ সন্তুষ্ট। জাপান যদি খরচ কমাতে পারে, সে ক্ষেত্রে এমআরটি–১ এবং এমআরটি–৬ নির্মাণে দেশটিকে যুক্ত করতে বিএনপি সরকার আগ্রহী। এর পাশাপাশি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর চালু করার লক্ষ্যে দুই দেশ কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এখনই নতুন করে কোনো বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে দুই দেশ যুক্ত হচ্ছে না।
জানতে চাইলে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট আ ন ম মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাপান দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে এই সম্পর্ক বহুমাত্রিক হচ্ছে। এতে সহযোগিতার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।’ তাঁর মতে, বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক ভারসাম্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের সঙ্গে সম্পর্কটা যখন বহুমাত্রিক হয়েছে, যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। ফলে নানা স্তরে সংযোগ, সফর কোন সময়ে করা হচ্ছে, সেটাতে একধরনের কূটনৈতিক বার্তা থাকে।