ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতা নিয়ে আজ বুধবার ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বাডাস) আয়োজিত এক সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। রাজধানীর শাহবাগে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মাল্টিপারপাস হলে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বক্তারা বলেন, ডায়াবেটিস শনাক্ত ব্যক্তিরা যেন বিষণ্নতার ক্ষতিকর দিকগুলো অবহিত হয়ে চিকিৎসা নেন, সে ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

সভায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বিষণ্নতা এবং ডায়াবেটিস শনাক্ত ব্যক্তিদের জন্য আচরণগত সক্রিয়করণ পদ্ধতির বিকাশ ও মূল্যায়ন’ শিরোনামের চলমান প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণাভিত্তিক এই প্রকল্পটিকে সংক্ষেপে ‘ডায়াডেম’ বলা হয়। প্রকল্পটি ‘আচরণগত সক্রিয়করণ’ নামের একধরনের থেরাপি নিয়ে কাজ করছে। পশ্চিমা বিশ্বে এটি বিষণ্নতা মোকাবিলায় একটি কার্যকর থেরাপি। বাংলাদেশেও এই থেরাপি কার্যকর কি না, তা বোঝাই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।

এই প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বাডাসের সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (সিএইচআরআই) এবং যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ডায়াবেটিস শনাক্ত ব্যক্তিদের ওপর বিষণ্নতা ও বহু ধরনের অসুস্থতার অবস্থা বুঝতে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটি শুরু হয়। এটির মেয়াদ চার বছর।

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুসারে, ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম। আনুমানিক দেড় কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অপর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ বিষণ্ণতায় ভুগছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিক জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৩৪ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রার বিষণ্নতায় আক্রান্ত।

সভায় বলা হয়, ডায়াডেম প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সফল হলে তা ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য এক বৈপ্লবিক উন্নয়ন হবে। নির্দিষ্টসংখ্যক ডায়াবেটিস শনাক্ত ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, কিছু পদক্ষেপ নিলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আগের চেয়ে সুস্থ বোধ করছেন। বিষণ্নতা কম থাকা অবস্থায় শনাক্ত হলে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ‘আচরণগত সক্রিয়করণ’ থেরাপি বিষয়ে বলা হয়েছে, একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন বিষণ্নতায় ভোগেন, তখন তিনি নিজেকে সবকিছু থেকে প্রত্যাহার করে নেন। তাঁর কাজের আগ্রহ কমে যায়। প্রাত্যহিক যেসব কাজ করলে তিনি আনন্দ পাবেন, সেসব কাজ করা বন্ধ করে দেন। আচরণগত সক্রিয়করণ থেরাপির মাধ্যমে ধাপে ধাপে ওই সব কাজে ওই ব্যক্তিকে আবার সম্পৃক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

বাডাসের প্রেসিডেন্ট জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস আক্রান্ত ও বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তিদের এই থেরাপি নিতে কীভাবে সচেতন করা যায় চিকিৎসকদের সে উপায় খুঁজে বের করতে হবে। কোন ভাষায় কথা বললে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ বিষণ্নতা দূর করতে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হবেন, সে ভাষা জানতে হবে। বিষণ্নতা দূর করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, কারা তা অব্যাহত রাখছেন সেটিও দেখতে হবে। তিনি সচেতনতা সৃষ্টিতে ধর্মীয় নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন।

প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপন করেন ডায়াডেম গবেষণার ট্রায়াল সমন্বয়কারী নাভীদ আহমেদ। তিনি বলেন, এ বছরের মার্চে ডায়াডেমের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। এরপর মার্চের শেষ থেকে মে মাস পর্যন্ত গবেষণার জন্য রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ঢাকা ও সিলেটের ৩৫৩ জনকে যাচাই–বাছাই করার পর ৬৪ জন রোগীকে নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে ৩২ জনকে ছয়টি সেশনে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সেবা দেওয়া হয়। বাকি ৩২ জনকে সাধারণ সেবা দেওয়া হয়। ১৬ আগস্ট তিন মাসের ফলোআপ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। ছয় মাসের ফলোআপ প্রক্রিয়া শুরু হবে ২ অক্টোবর থেকে। পুরো প্রক্রিয়া শেষের পর সেবা পাওয়া ব্যক্তিদের অবস্থা জেনে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। তবে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, এই ব্যক্তিরা আগের চেয়ে ভালো বোধ করছেন।

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্পের প্রধান গবেষক পাকিস্তানের নাজমা সিদ্দিকি তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, একই সঙ্গে ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের আয়ু ২০ বছর কমে যেতে পারে। ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক অসুস্থতার আশঙ্কা দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
সভায় ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরান সিদ্দিকি প্রথম দিকেই ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতা শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডায়াডেম প্রকল্পের উপপরিচালক আবদুল কুদ্দুস। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, একই হাসপাতালের শিশু–কিশোর এবং পারিবারিক মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক, বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক এম কে আই কাইয়ুম চৌধুরী।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন