হামে সপ্তাহে ৫০ জনের বেশি মৃত্যু
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু এখনো কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। মৃত্যুও কমছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে ৫৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫৭টির বেশি শিশু মারা গেছে।
দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয় চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে। ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাম পরিস্থিতির বিষয়ে গণমাধ্যমে তথ্য দিয়ে আসছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বশেষ সপ্তাহে (১৮-২৪ মে) ৫৯ টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হামে নিশ্চিত সংক্রমণ কিছুটা কমলেও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি এখনো উদ্বেগজনক। এর পাশাপাশি হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টা সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭৩২ রোগী।
তবে ছুটির সময় সাধারণত হাসপাতালে মানুষ কম যায়। তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। ২৫ মে ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে। ছুটি চলবে ৩১ মে পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে শুধু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা নয়, মৃত্যুর প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ, আক্রান্তের সংখ্যা অনেক সময় সীমিত পরীক্ষা, নজরদারির দুর্বলতা বা তথ্যের ঘাটতির কারণে কম হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নাজমুল হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর প্রবণতা সাধারণত সংক্রমণের গতিবিধি বোঝার জন্য বেশি নির্ভরযোগ্য সূচক। বর্তমানে বাংলাদেশে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এখনো পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হামের টিকা সময়মতো না দেওয়া, শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি, ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ক্যাম্পেইন না হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়কে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংক্রমণ ও মৃত্যু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৯ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল ছিল হামের সংক্রমণের ১৪তম সপ্তাহ। তখন দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৩৬। ১ সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯৯২ জনে।
পরের সপ্তাহগুলোতেও সংক্রমণ উচ্চপর্যায়ে থেকে গেছে। হাম ও হামের উপসর্গের রোগীর সংখ্যা ১৬তম সপ্তাহে (১২ থেকে ১৮ এপ্রিল) ছিল ৮ হাজার ৭৯৩। পরপর দুই সপ্তাহে এমন রোগীর সংখ্যা ৯ হাজারের ওপর। ১৯তম সপ্তাহে (৩ থেকে ৯ মে) রোগী হয় ১০ হাজার ১৯০। পরের সপ্তাহে তা হয় ৯ হাজার ৮৬৪। ২১তম সপ্তাহেও (১৭ থেকে ২৩ মে) আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৭২৩।
আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর প্রবণতাও উদ্বেগ তৈরি করছে। হাম ও উপসর্গ নিয়ে ১৪তম সপ্তাহে মৃত্যু ছিল ৯। এরপরের সপ্তাহে ছিল ৫৩। ২১তম সপ্তাহে এসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে মোট ৫১২।
শুধু টিকাদান নয়, রোগ ব্যবস্থাপনাও জরুরি
হামের প্রাদুর্ভাবের পর বেশি আক্রান্ত ৩০টি উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয় ৫ এপ্রিল। আর ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী টিকাদান শুরু হয়। যদিও ২৬ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সব জেলায় হাম ছড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমে টিকা দেওয়া হয় কেন্দ্রে কেন্দ্রে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার যে পরিচিত ধারা, সেটি বজায় রাখা হয়নি। আর শুধু টিকা দিলেই তো হবে না। এর সঙ্গে রোগ ব্যবস্থাপনাও জরুরি। কিন্তু সে জায়গায় কাজ নেই। এ জন্য রোগীর ভর্তির হার শীর্ষ বিন্দুতে (পিক পয়েন্ট) অব্যাহত আছে। মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রচারণা নেই
শিশুরা যেসব ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো হাম। বড়রা এ ভাইরাস থেকে কিছু ক্ষেত্রে সুরক্ষা পেলেও ছোটদের জন্য তা সম্ভব হয় না। এরই মধ্যে ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গেছেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে হাম আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার কোনো সুস্থ শিশু বেশি সংক্রমিত এলাকায় গিয়ে আক্রান্ত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রচারণা জরুরি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন সংক্রমণের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়গুলো প্রচার করা জরুরি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো প্রচারণা দেখিনি। মনে হচ্ছে, কোথাও কিছু হয়নি। এই যে উপেক্ষা করার সংস্কৃতি, সেটা সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।’