বিনিয়োগে মুনাফার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিতে হবে: রাশেদ তিতুমীর
ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত প্রভাবকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবুজ শিল্পায়ন, সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজ শনিবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নসরুল হামিদ মিলনায়তনে ‘জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, করণীয় নির্ধারণ এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে ব্রতী সমাজকল্যাণ সংস্থা ও নিরাপদ অ্যালায়েন্স।
সেমিনারে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ঋণ বা প্রকল্প গ্রহণের আগে অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের সুফল (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত সামঞ্জস্য—এই চার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ না হলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়।
বর্তমান সময়ে দেশের তরুণদের সামনে কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও জীবনমান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এ বাস্তবতা মোকাবিলায় সরকার দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে—অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণ।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ এবং সবার ওপরে মানুষ—নীতিকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে’
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক মডেলের দিকে যেতে চায়, যেখানে বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে করের হার না বাড়িয়েও অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং সেই অর্থ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতে ব্যয় করা যাবে।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও ইলেকট্রিক পরিবহনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে ইলেকট্রিক বাস, রেলওয়ের ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পায়ন যেমন এগোবে, তেমনি বায়ুদূষণও কমবে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দেশের পানি, কৃষি, শিল্প ও নদী ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নদীর প্রবাহ, জলাশয় সংরক্ষণ, পুনঃখনন ও পরিবেশবান্ধব কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। হাওর-বাঁওড় অঞ্চলের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি বরেন্দ্র অঞ্চলে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলারও উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
‘দায়বদ্ধতা ছাড়া জলবায়ু সংকটের সমাধান সম্ভব নয়’
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে ব্রতী সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান নির্বাহী এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে শুধু অভিযোজনের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং দারিদ্র্যের নারীকরণ সেই বাস্তবতারই বহুমাত্রিক প্রকাশ।
বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও উন্নত দেশগুলোর কার্যকর দায়বদ্ধতা ছাড়া জলবায়ু সংকটের সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে শারমিন মুরশিদ আরও বলেন, তৃণমূলভিত্তিক গবেষণা, স্থানীয় উদ্ভাবন ও নাগরিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে দেশের ভেতরেও একটি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি পরিবেশগত সংকট নয়, মানুষের ভোগবাদী জীবনধারা, বন উজাড়, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন এর অন্যতম কারণ। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য মাঠপর্যায়ের কৃষক ও স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
ব্রতী সমাজকল্যাণ সংস্থার চেয়ারপারসন ফাওজিয়া করিম ফিরোজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও স্থানীয় অংশীদারত্বকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু-সহনশীল উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা উচিত, যাতে মানুষ নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে পারেন।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) সহ-আহ্বায়ক এম এস সিদ্দিকী বলেন, জলবায়ু–সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করলে হবে না; বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন ও সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতির ভেতরেই টেকসই সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
একই সংগঠনের সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমাধান শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়; জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক—তিন স্তরেই সমন্বিত উদ্যোগ ও নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তব্য দেন ব্রাইটারস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারিহা অমি, নিরাপদ অ্যালায়েন্সের সহসভাপতি তাহমিদুর রহমান, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ারের অপারেশন লিড জুবায়ের ইসলাম, ইয়ং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস, ব্রাইটারস ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাইদুর রহমান সিয়াম, গর্জন সমাজকল্যাণ সংস্থার সদস্য নুর জাহান মুক্তা, ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের পরিচালক সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া প্রমুখ।