যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার চান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সমাবেশে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনেছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। বর্তমান জাতীয় সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির এই সদস্য।

এই চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার দেশের আর কী কী ‘সর্বনাশ’ করেছে, সেটির বিষয়ে তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা ও অপরাধীদের বিচারের দাবি তুলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সর্বনাশা কাজ করেছে। তাঁদের অনেকে হয়তো এখন বিদেশে থাকেন। যেখানেই থাকুক, তাঁদের বিচার করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।’

এই চুক্তি পড়ে কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে এই দাসখতে ঢুকিয়ে গেছে
মাহা মির্জা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক সমাবেশে অংশ নিয়ে আনু মুহাম্মদ এ কথাগুলো বলেন। ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এই সমাবেশে তিনি ছিলেন সভাপ্রধান।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল দাবি করে সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তি বহাল থাকলে দেশের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একটা চোখ, কান ও মাথা বন্ধ করা একটা জাতিতে পরিণত হব, যারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ রকম একটা ভয়ংকর অবস্থায় যেতে না চাইলে সমাজের সব পর্যায় থেকে এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আসতে হবে।’

এই চুক্তি নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার কী ভূমিকা পালন করছে, সেই ভূমিকা জনস্বার্থের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ, তা অধিকার কমিটি পর্যালোচনা করছে বলে উল্লেখ করেন আনু মুহাম্মদ। ২৫ এপ্রিল সেই পর্যালোচনার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ অন্য বক্তারা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

সংসদে অনুমোদিত না হলে বাণিজ্যচুক্তিটি কার্যকর হবে না উল্লেখ করে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সংসদকে এই চুক্তি ডিজওন (অস্বীকার) করতে হবে। এই চুক্তির কোনো দায়দায়িত্ব এই সরকার বা সংসদ নেবে না, এ রকম একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি আমদানিনির্ভর ও ঋণমুখী প্রাণপ্রকৃতিবিনাশী তৎপরতা ও প্রকল্প বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া এই সরকারের একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার কী কী সর্বনাশ করেছে, তার তদন্ত করে একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা ও অপরাধীদের বিচার করা।

সংসদে মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান, তেল-গ্যাসসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পনা নেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সবাইকে সরব হওয়ার আহ্বান জানান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, জনগণ যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, এই নেতা-সেই নেতার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে বাংলাদেশ এই বিপদ থেকে বাঁচতে পারবে না।

‘এই চুক্তি দাসখত’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিকে ‘দাসখত লেখা’ আখ্যায়িত করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সমাবেশে তিনি বলেন, ‘যখন ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক শাসক ছিল, তখন ভারতে কে কী করতে পারবে, সেটা ব্রিটিশরাজ বা ভাইসরয় ঠিক করত। এখন আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আছি, সব খরচ ও দায়দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে, কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মতো যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ আমাদের ওপর চাপাবে।’

এই চুক্তি বহাল থাকলে দেশের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একটা চোখ, কান ও মাথা বন্ধ করা একটা জাতিতে পরিণত হব, যারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

বর্তমান সংসদের একজন সদস্যও বাণিজ্যচুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সংসদে কথা না বলায় আক্ষেপ করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘একটা দেশকে দাসে পরিণত করার জন্য চুক্তি করল অন্তর্বর্তী সরকার। এখতিয়ারের মধ্যে না থাকলেও তারা এই চুক্তি ছাড়াও স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে, এলএনজি আমদানির চুক্তি করেছে, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়েও চুক্তি করেছে। সে সময় ঐকমত্য কমিশন ও ইউনূস সাহেবের বাসভবন যমুনায় একের পর এক সভা হয়েছে, যেখানে সব নেতারা গিয়েছেন। সেখানে চা-বিস্কুট খাওয়া হয়েছে, হাসি-ঠাট্টা ও তর্কবিতর্ক হয়েছে। কিন্তু কেউ অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেনি যে এসব চুক্তি আপনারা করবেন না।’

সে কারণে বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকেও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, নির্বাচিতরা জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে জনগণের দায়িত্ব হচ্ছে তাঁদের এই ভূমিকার বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়ানো, যাতে এ ধরনের একটা দেশধ্বংসী, দেশবিনাশী ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য ভয়ংকর বোঝা এই চুক্তি যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশে না হয়।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেখতে চাইলে বা অন্য যেকোনো দেশের আধিপত্যের বাইরে রাখতে হলে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে, আমরা ওয়াশিংটন, দিল্লি, ইসলামাবাদ, বেইজিং, মস্কো—কোনো আধিপত্যই মানব না, বাংলাদেশ বাংলাদেশের জায়গায় থাকবে। বাংলাদেশকে নিজের মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিকে ‘দাসখত লেখা’ আখ্যায়িত করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সমাবেশে তিনি বলেন, ‘যখন ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক শাসক ছিল, তখন ভারতে কে কী করতে পারবে, সেটা ব্রিটিশরাজ বা ভাইসরয় ঠিক করত। এখন আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আছি, সব খরচ ও দায়দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে, কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মতো যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ আমাদের ওপর চাপাবে।’

‘সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে’

সমাবেশে অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে এমন সব ধারা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ও স্থানীয় শিল্পসহ সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

দেশের স্বার্থের সঙ্গে এত বড় গাদ্দারি কী করে হতে পারে, সেই প্রশ্ন করে মাহা মির্জা বলেন, ‘এই চুক্তি পড়ে কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে এই দাসখতে ঢুকিয়ে গেছে।’

‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সমাবেশে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

এই চুক্তি বাতিল না হলে বাংলাদেশের পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় থাকবে না বলে মন্তব্য করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহা মির্জা। মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশও এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসবে, সেই আশা রেখে তিনি বলেন, এই চুক্তি বাতিল না হলে দেশের প্রতিটি শিল্প, কৃষক ও কৃষি খাতে ভয়ানক বিপর্যয়ে হবে। সংসদে আলোচনা করে এই ক্ষতিকর চুক্তি বাতিল করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির কারণে ভবিষ্যতে ওষুধ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে এবং ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে উল্লেখ করেন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা এই চুক্তি মানি না। এই চুক্তি বাতিল করতে হবে।’

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ সমাবেশ সঞ্চালনা করেন। আরও বক্তব্য দেন কমিটির ময়মনসিংহ শাখার নেতা আবুল কালাম আজাদ। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক দীপা দত্ত, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, শিল্পী অরূপ রাহী প্রমুখ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।