গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে, অগ্রাধিকারে শিল্প খাত, লোডশেডিং কিছুটা কমেছে
দেড় মাসের বেশি সময় পর দেশে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর গত সোমবার রাত থেকেই বেড়েছে সরবরাহ। গতকাল মঙ্গলবার যা আরও কিছুটা বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ বাড়ানোর পর সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে শিল্প গ্রাহকদের। বাড়তি গ্যাসের অধিকাংশ যাচ্ছে শিল্প খাতে।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আর আমদানি করে পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনায় শুরুতে সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সময়মতো এলএনজির কার্গো না আসায় সরবরাহ বাড়াতে দেরি হয়েছে। এখন নিয়মিত আসছে কার্গো।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একাধিকবার দরপত্র দিলেও সব কটি পাওয়া যায়নি। দামও অনেক বেড়ে গেছে। এ মাসে সব মিলিয়ে ৯টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। গত সোমবার রাত ১০টায় এলএনজি সরবরাহ করা হয় ৯৮ কোটি ঘনফুট। আর গতকাল রাত আটটায় এটি বেড়ে হয়েছে ১০১ কোটি ঘনফুট। এতে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৬৩ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ঘনফুট।
এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তার আগে দিনে সরবরাহ করা হচ্ছিল ২৬৪ কোটি ঘনফুট। তখন এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হতো ৯৯ কোটি ঘনফুট। এখন এলএনজি থেকে একই পরিমাণ সরবরাহ করা হলেও দেশি গ্যাস থেকে এরই মধ্যে উৎপাদন কমেছে ৪ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একাধিকবার দরপত্র দিলেও সব কটি পাওয়া যায়নি। দামও অনেক বেড়ে গেছে। এ মাসে সব মিলিয়ে ৯টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানভর যুক্তরাষ্ট্রের দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরামকোর দুটি এবং খোলাবাজার থেকে কেনা হয়েছে পাঁচটি।
চাপ ১০ পিএসআই থাকার কথা, আসছে ৪ পিএসআই। আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।সৈয়দ ইমতিয়াজ রাজীব, মহাব্যবস্থাপক, ফকির নিটওয়্যার লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জ
আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, এ মাসে আরামকোর দুটি, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও পস্কোর একটি করে কার্গো ইতিমধ্যে এলএনজি সরবরাহ করেছে। এরপর আজ ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো ও ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের একটি করে কার্গো আসার কথা। ফলে এলএনজি থেকে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই অক্টোবরের জন্য ১১টি এলএনজি কার্গো কেনার প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে অক্টোবরের ৮টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে। আরও ৩টি কিনতে গতকাল দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কায়েমপুর এলাকার ফকির নিটওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ইমতিয়াজ রাজীব বলেন, চাপ ১০ পিএসআই থাকার কথা, আসছে ৪ পিএসআই। আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কারখানা চালাতে যতটুকু চাপ প্রয়োজন, সেই পরিমাণ চাপ গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
গত সোমবার দিবাগত রাত একটায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। গতকাল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এর আগে গত মাসে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। এ হিসাবে আগের তুলনায় লোডশেডিং কমে এসেছে।
লোডশেডিং থামেনি, কিছুটা কমেছে
গ্যাসের সংকটে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলেও কয়লার স্বল্পতা ও কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছিল না। এতে এক মাস ধরেই সারা দেশে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এটি কমাতে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফার্নেস তেলের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় বেশি করা যাচ্ছে না। ২০ সেপ্টেম্বরের পর তেল থেকে উৎপাদন বাড়ানো হতে পারে।
গত বুধবার রাত ১২টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে উৎপাদন আরও কমায় দেশে লোডশেডিং বেড়ে যায়। গত রোববার দুপুর ১২টায় আদানির দ্বিতীয় ইউনিট থেকে সরবরাহ শুরু হয়। এরপর কেন্দ্রটি থেকে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি করে সরবরাহ করা হচ্ছে।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে যায় বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। এক ইউনিট বন্ধের পর গতকাল ৬১০ মেগাওয়াট উৎপাদন করেছে কেন্দ্রটি। এটি আবার পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে আরও দুই দিন লাগতে পারে।
পটুয়াখালীতে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে দুটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। প্রতিটি কেন্দ্র ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় নির্মিত হয়। এর মধ্যে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ আছে। এতে উৎপাদন হচ্ছে ৫৭০ মেগাওয়াট। এখানে পর্যাপ্ত কয়লা আছে। আর একই জেলার আরেকটি কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ বাড়ার পর গতকাল ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্র বলছে, সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় কয়লা থেকে। কিন্তু এক মাস ধরে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। জ্বালানি তেল থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করা হচ্ছে। গত সোমবার দিবাগত রাত একটায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। গতকাল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এর আগে গত মাসে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। এ হিসাবে আগের তুলনায় লোডশেডিং কমে এসেছে।
[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ]