একই অবস্থা সম্পত্তি বা পদের অধিকার সম্পর্কিত দেওয়ানি মামলায়ও। সমন জারি ও গ্রহণে দেরি, বারবার সময়ের আবেদন, ওয়ারিশদের পক্ষভুক্তি, আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়া, বিচারাধীন আদালতের প্রতি অনাস্থা এনে বিবিধ মামলা করা, ভূমি পরিমাপে কমিশন নিয়োগে দেরি, আরজি সংশোধন, বারবার আপত্তি দিয়ে সময়ক্ষেপণের কারণে ঝুলে থাকে মামলাগুলো।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়া উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বাদী-বিবাদী দুই পক্ষেরই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হওয়ায় তাদের সব পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীনে রয়েছে ৩৩টি থানা। মামলার বিচারের জন্য আদালত রয়েছে ৭৬টি। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায়, এসব আদালতে বিচারাধীন ২ লাখ ৫৯ হাজার ২৭৮টি মামলা। এর মধ্যে ফৌজদারি মামলা ১ লাখ ৫০ হাজার ৩১৮। দেওয়ানি মামলা ১ লাখ ৮ হাজার ৯৬০টি। তুলনামূলকভাবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার সংখ্যা বেশি। এখানে অর্ধলক্ষাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।

এসব আদালতে দৈনিক ৭০ থেকে ৭৫টি মামলা হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় ৩৩ থানায় হওয়া দৈনিক আরও ৭০ থেকে ৮০টি মামলা। অর্থাৎ দৈনিক দেড় শর মতো নতুন মামলা আদালতে আসছে। এর মধ্যে ৫ থেকে ১০ বছরের পুরোনো মামলা রয়েছে ৬০ হাজারের বেশি। আইনজীবীদের মতে, মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা কম। বিচারকের সংখ্যা বাড়লে বিচারে গতি আসবে।

৩২ বছরের অপেক্ষা

১৯৯০ সালের ১৮ মার্চ বোয়ালখালী উপজেলার খিতাবচরে নিজ বাড়ির পাশে গুলিতে মারা যায় দশম শ্রেণির ছাত্র বখতিয়ার। ১৯৯৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এ–সংক্রান্ত মামলাটির বিচার শুরু হয়। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণে কেটে গেছে ২৫ বছর। ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেন আদালত। এরপর সাফাই সাক্ষী দেওয়ার কথা বলে আসামিরা ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত মামলার বিভিন্ন তারিখে সময়ের আবেদন করতে থাকেন। আদালত নাকচ করলে সাক্ষীদের আবার ডাকার জন্য আবেদন করে আসামিপক্ষ। সেটিও নাকচ হলে পরে তাঁরা হাইকোর্টে যান। চলতি বছরের ৩১ মার্চ হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেন। আদেশটি আদালতে এসেছে। ১৬ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। মামলার পাঁচ আসামি জামিনে রয়েছেন।

আদালত সূত্র জানায়, পুলিশ ১৯৯০ সালের ১০ নভেম্বর আদালতে মামলাটির অভিযোগপত্র দেয়। এরপর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আদালতে এই মামলার তারিখ পড়ে ২৩৭ বার। ধার্য তারিখে আসামিদের হাজিরা দিতে হয়। বাদীকে আসতে হয় মামলার খোঁজ নিতে। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের হাজির হতে হয়। সব মিলিয়ে সব পক্ষই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দিনের পর দিন।

নিহত বখতিয়ারের বাবা মামলার বাদী এ কে এম গোলাম শরীফ বয়সের ভারে এখন খুব একটা চলাফেরা করতে পারেন না। কথাও জড়িয়ে যায়। নিহত বখতিয়ারের ভাই গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুতে মামলার প্রতিটি ধার্য দিনে বাবা আদালতে যেতেন। ৫ থেকে ১০ বছর পরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আদালতে যাওয়া-আসার কষ্ট, আর্থিক খরচ—এসব তো আছেই। এখন আর আদালতে যান না। আর কত খবর নেবেন?’

জমি নিয়ে ২৭ বছরের ‘লড়াই’

বেদখল হওয়া জমি নিয়ে করা একটি মামলা গত ২৭ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। জায়গাটির মালিকানা কার, এটি পরিমাপের জন্য কমিশন (ভূমি জরিপে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ভূমি পরিমাপক ব্যক্তি) দ্বারা সরেজমিন প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন আদালত। এরপর সেটি গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। এখন আইনি প্রক্রিয়ায় সেটি ঘুরপাক খাচ্ছে। ইতিমধ্যে মারা গেছেন মামলাটির বাদীপক্ষের প্রথম আইনজীবী নুরুল হুদা।

নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ মৌজার ১১ দশমিক ২ শতাংশ জায়গা বেদখলের অভিযোগে ১৯৯৫ সালের ৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা হয়। বাদী চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক। বিবাদী করা হয় একটি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের তিন ব্যক্তিকে। একই বছরের জুলাইয়ে আদালত সার্ভেয়ারকে দিয়ে জায়গাটি পরিমাপের আদেশ দেন। পরিমাপের পর সার্ভেয়ার ১৯৯৮ সালে প্রতিবেদন দিলে সেটার বিরুদ্ধে আপত্তি দেয় বিবাদীপক্ষ।

তাদের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও দুই বছর সময় পার হয়। তারপর ২০১০ সালে ওই জমিতে নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বাদীপক্ষ আবেদন করে। এরপর পার হয় আরও ১০ বছর। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১২ জুলাই আদালত নিরপেক্ষ সার্ভেয়ার হিসেবে হুমায়ুন কবির নামের একজনকে জায়গাটি পরিমাপের দায়িত্ব দেন। তিনি কাজও শুরু করেন। একপর্যায়ে আদালতকে লিখিতভাবে জানান, এটি পরিমাপ করতে তিন লাখ টাকার সরঞ্জাম কিনতে হবে। পরে আদালত ওই সার্ভেয়ারকে দেওয়া আদেশটি বাতিল করে দেন। এরপর জায়গা পরিমাপের আবেদন, পাল্টা আবেদন শেষ পর্যন্ত গড়ায় হাইকোর্ট পর্যন্ত। বর্তমানে এটি আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন আইনজীবী আবুল কাসেম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জায়গার পরিমাপ করতে গিয়েই বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে, যার কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে।

তবে বিবাদীর আইনজীবী সৈয়দ কুদরত আলী প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, জায়গাটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। যাবতীয় কাগজপত্র রয়েছে তাঁদের। মামলার কারণে বিবাদীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।

মারা গেছেন বাদী-সাক্ষী

২৮ বছর আগে ১৯৯৪ সালের ২০ জানুয়ারি লোহাগাড়া উপজেলার দক্ষিণ কুটিভিলার তিনকুনিয়াপাড়ায় ডাকাতের গুলিতে আহত হন মোহাম্মদ হোসেন নামের এক যুবক। পরে তিনি মারা যান। এই ঘটনায় তাঁর চাচা সাহেব মিয়া বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

চট্টগ্রাম বিশেষ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এই মামলার সর্বশেষ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি। গত ২০ অক্টোবরও সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ছিল, কিন্তু কোনো সাক্ষী আসেননি। এমনকি পুলিশ সাক্ষীও হাজির হচ্ছেন না। আদালত থেকে বারবার পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও সাক্ষীদের হাজির করা হচ্ছে না।

রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি মো. জাহাঙ্গীর আলম সাক্ষীদের হাজির করতে না পারার পেছনে পুলিশকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, সাক্ষীদের হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের।

জানা গেছে, মামলাটির ২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৭ জন এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন।

বিচার শেষ না হওয়ায় নিহত হোসেনের পরিবার হতাশ। তাঁর ভাই মনজুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আর কত খবর নিব। বিচার কবে শেষ হবে জানি না।’

ঝুলে আছে আলোচিত মামলাও

২০০৩ সালে বাঁশখালীতে সংখ্যালঘু পরিবারের ১১ জনকে পুড়িয়ে মারা, বন্দরে কোকেন জব্দ, বিএনপির নেতা ও ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন হত্যা, সীতাকুণ্ডে জঙ্গিদের বিস্ফোরণে ছয়জনের মৃত্যু, চলন্ত বাসে পোশাককর্মীকে ধর্ষণ, রেলওয়ের কোটি টাকার দরপত্র নিয়ে জোড়া খুন, তালসরা দরবারের কোটি টাকা লুটসহ অর্ধশতাধিক চাঞ্চল্যকর মামলা সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে।

বাঁশখালী ১১ হত্যা মামলার বাদী বিমল শীল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত বছরেও বিচার পাইনি। পাব কি না, জানি না। এখন আর আদালতেও যাই না।’

সরকারি কৌঁসুলিরা যা বলেন

রাষ্ট্রপক্ষে সরকারি কৌঁসুলিরা (পিপি) মামলা পরিচালনা করে থাকেন। বিচারপ্রার্থীদের কারও কারও অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় সাক্ষী এলেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও অনেক সময় সময়ের আবেদন করা হয়। এতে মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হয়।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গত আগস্টে এই দায়িত্বে এসেছেন। কোনো কৌঁসুলির বিরুদ্ধে গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।

দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর চলে যায় বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) নজমুল আহসান খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মামলা বাড়লেও বিচারকের সংখ্যা বাড়েনি। বাদী, বিবাদী ছাড়াও আইনজীবীদের আরও আন্তরিক হতে হবে, যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মামলার সংখ্যা বাড়লেও ১৫ বছরে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের পদ বাড়েনি। পাশাপাশি সাক্ষীদের দ্রুত হাজির করে মামলা নিষ্পত্তিতে পুলিশ, পিপি, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের আরও আন্তরিক হওয়া উচিত মনে করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

করণীয় কী

সরকারি কৌঁসুলি, আইনজীবী, বাদী, বিবাদী, আসামিসহ সংশ্লিষ্টদের মামলা নিষ্পত্তিতে সর্বপ্রথম আন্তরিক হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং ব্লাস্টের আইন উপদেষ্টা এস এম রেজাউল করিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এঁদের ছাড়া আদালত একা চাইলে মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। দ্রুত সমন জারির ব্যবস্থা করতে হবে। অপ্রয়োজনে বারবার সময় নিয়ে মামলা বিলম্বিত করা যাবে না। যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়ে সাক্ষীদের দ্রুত হাজির করে সাক্ষ্য শেষ করতে হবে। এভাবে চললে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারি কৌঁসুলিদের আরও বেশি আন্তরিক হতে হবে।

চেক প্রত্যাখ্যাত, পারিবারিক, ছোটখাটো ঘটনা ও দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি হলে আদালতে জট কমবে বলে মত দেন সাবেক এই জেলা ও দায়রা জজ।