‘আই উইল সি ইউ এগেইন’—ডেঙ্গুতে হারানো বন্ধুর জন্য ছোট্ট জাইমার চিঠি
ফ্রক পরা দুটি ছোট্ট মেয়ের ছবি। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, হাতে হাত রাখা। একজনের মাথার কাছে লেখা ‘হিয়া’, অন্যজনের মাথার কাছে ‘জাইমা’। মাঝখানে ভালোবাসার চিহ্ন। ছবির নিচে শিশুসুলভ হাতে লেখা, ‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’ লেখার নিচে আবার আঁকা ভালোবাসার চিহ্ন।
মাত্র আট বছরের জাইমা ছবিটি এঁকেছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিয়ার জন্য। কিন্তু ছবিটি আঁকার সময় হিয়া আর তা দেখার অবস্থায় নেই। কারণ, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে বের করা হচ্ছিল তার নিথর শরীর।
কাঁদতে কাঁদতে বন্ধুর জন্য ছবিটি এঁকেছিল জাইমা। পরে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা হিয়ার কফিনের একটি রশির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয় ছবিসহ সেই ছোট্ট চিরকুট।
স্কুল বদলেছে, বদলায়নি বন্ধুত্ব
খায়রাতুন হিয়া ও সুহায়লা জাইমা—দুজনের বয়সই আট বছর। রাজধানীর দুটি ভিন্ন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী তারা। প্লে গ্রুপ থেকে কেজি পর্যন্ত একই স্কুলে পড়েছে দুজন। তখন তাদের বাসাও ছিল পাশাপাশি।
প্রথম শ্রেণিতে ওঠার পর বদলে যায় স্কুল। হিয়া পড়ত মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আর জাইমা ওয়াইডব্লিউসিএতে। এ সময় বদলে যায় বাসাও। কিন্তু বদলায়নি দুজনের বন্ধুত্ব।
দুই স্কুলে পড়লেও ভিডিও কলে নিয়মিত কথা হতো তাদের। জন্মদিন কিংবা পারিবারিক কোনো আয়োজনেও দুই পরিবার থাকত একসঙ্গে। দেখা হলে একজন আরেকজনের গাল টিপে দিত। ছবি আঁকত, একজন আরেকজনকে উপহার দিত।
১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় হিয়ার।
মাত্র আট বছরের জাইমা ছবিটি এঁকেছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিয়ার জন্য। কিন্তু ছবিটি আঁকার সময় হিয়া আর তা দেখার অবস্থায় নেই। কারণ, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে বের করা হচ্ছিল তার নিথর শরীর।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মা-মেয়ে
হিয়ার বাবা মো. খোকন মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রকৌশল বিভাগে সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। একমাত্র মেয়েকে দাফন শেষে বর্তমানে তিনি কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে আছেন।
২ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে খোকন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৫ আগস্ট প্রথমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হিয়ার মা শাহীনা আক্তারকে আগারগাঁওয়ের লায়ন্স আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হিয়ার ডেঙ্গু শনাক্ত হলে ২৮ আগস্ট তাকেও একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরদিন, ২৯ আগস্ট হিয়াকে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়।
হিয়ার মা শাহীনা আক্তার মুঠোফোনে বলেন, নিজের চিকিৎসা পুরোপুরি শেষ না করেই তিনি মেয়ের সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে এখন গ্রামের বাড়িতে। ঢাকায় ফেরার পর আবার চিকিৎসকের কাছে যাবেন।
মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে শাহীনার। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করে মেয়েকে সময় দেব বলে কোনো চাকরি করিনি। আমাদের একমাত্র মেয়ে। চিকিৎসায় তো কোনো গাফিলতি করিনি। মেয়েটা বমি করত। পানিও খেতে পারত না। খিঁচুনি হলো। তারপর সব শেষ। কী আর বলব?’
সরকারের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই শাহীনার। শুধু জানেন না, কোন মশার কামড়ে তাঁর মেয়ের ডেঙ্গু হয়েছিল। কেবল আক্ষেপের স্বরে বলেছেন, ‘আমার মেয়ের হায়াত ছিল না, এটাই মেনে নিয়েছি।’
পড়াশোনা শেষ করে মেয়েকে সময় দেব বলে কোনো চাকরি করিনি। আমাদের একমাত্র মেয়ে। চিকিৎসায় তো কোনো গাফিলতি করিনি। মেয়েটা বমি করত। পানিও খেতে পারত না। খিঁচুনি হলো। তারপর সব শেষ। কী আর বলব?
‘বাসায় যেতে চেয়েছিল’
এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও ছোট্ট হিয়া বুঝতে পারেনি তার শরীর কতটা খারাপ।
বাবা খোকন মিয়া বলেন, লায়ন্স হাসপাতাল থেকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে দিতে বলেছিল হিয়া। বাসায় যেতে চেয়েছিল। জানতে চেয়েছিল, তখন ঘড়িতে কয়টা বাজে, দিন নাকি রাত। আইসিইউতে নেওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে আর তেমন কোনো কথা বলার সুযোগ হয়নি।
মেয়েকে হারানোর পর খোকন মিয়ার একটাই চাওয়া, আর কোনো পরিবারকে যেন এমন শোক সইতে না হয়। তাঁর ভাষায়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
খোকন মিয়া বলেন, ‘আর কোনো বাচ্চাকে যেন এভাবে হারাতে না হয়। সরকার প্রায়োরিটি দিয়ে মশা মারুক। এত বছর হয়ে গেল, সরকার এখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। মশার উৎপাতও কমাতে পারল না।’
বাসা থেকে যাওয়ার সময় নিজের ব্যাগে প্যাডের কাগজ নিয়ে গিয়েছিল জাইমা। হাসপাতালে বসেই পেনসিল দিয়ে আঁকতে শুরু করে—দুটি ছোট্ট মেয়ের ছবি। একজন হিয়া, অন্যজন জাইমা। দুজনের হাত ধরা। তারপর নিচে লিখল, ‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’
মায়ের জন্মদিন নিয়ে পরিকল্পনা
হিয়ার জন্মদিন ছিল ১৩ জুলাই। সেদিন বন্ধুদের নিয়ে অনেক আনন্দ করে কেক কেটেছিল সে। আর মা শাহীনার জন্মদিন ১৮ সেপ্টেম্বর।
হিয়া ঘুরতে খুব পছন্দ করত। গত ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরে এসেছে। সামনে মেয়েকে নিয়ে সাজেকে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল পরিবারের।
বাবা খোকন মিয়া বলেন, মা-মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সাজেকে যাওয়ার পরিকল্পনা আর এগোয়নি। তবে হাসপাতালে বসেও হিয়া ভেবেছিল, মায়ের জন্মদিন সাজেকে গিয়ে উদ্যাপন করবে। তবে সেখানে তার পছন্দের কেক পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় ছিল মেয়ে।
মেয়ের কথা বলতে বলতে খোকন মিয়া জানান, মায়ের জন্মদিনের জন্য আগেই একটি উপহারের কার্ড বানিয়ে দিয়েছিল হিয়া। কার্ড দেওয়ার পর ছবিও তুলতে বলেছিল।
মা ও মেয়ে বেশির ভাগ সময় একই রকম পোশাক পরত। মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে একই রকম জামা কিনে রাখা হয়েছিল। এখন সবই স্মৃতি বলে জানিয়েছেন খোকন মিয়া।
বন্ধুর নিথর শরীরের পাশে বন্ধু
জসীম উদ্দীন-মোশফেকা রহমান দম্পতির মেয়ে সুহায়লা জাইমা। হিয়ার মৃত্যুর খবর সে পেয়েছিল স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতির সময়। সেদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে হিয়াকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তার। স্কুলড্রেস পরে তৈরি হচ্ছিল জাইমা। তখনই খবর আসে—হিয়া আর নেই।
স্কুলড্রেস পরা অবস্থাতেই বাবা জসীম উদ্দীনের হাত ধরে হাসপাতালে ছুটে যায় আট বছরের জাইমা।
পেশায় সাংবাদিক জসীম উদ্দীন বলেন, কাছের কোনো মানুষের মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতা জাইমার এটাই প্রথম। হাসপাতালে বন্ধুকে দেখে সে বারবার জানতে চাইছিল, এখন সে কী করবে।
বাসা থেকে যাওয়ার সময় নিজের ব্যাগে প্যাডের কাগজ নিয়ে গিয়েছিল জাইমা। হাসপাতালে বসেই পেনসিল দিয়ে আঁকতে শুরু করে—দুটি ছোট্ট মেয়ের ছবি। একজন হিয়া, অন্যজন জাইমা। দুজনের হাত ধরা। তারপর নিচে লিখল, ‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’
জাইমার বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছবি আঁকা শেষ করে জাইমা সেটি হিয়াকে দিতে চেয়েছিল। পরে অ্যাম্বুলেন্সে কফিনের একটি রশির সঙ্গে ছবিসহ চিরকুটটি বেঁধে দেওয়া হয়।’
এর আগে ‘বন্ধুর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পা দুটি ধরে ছোট্ট জাইমা কান্নাকাটি করেছিল’ বলে জানিয়েছেন বাবা জসীম উদ্দীন।
ছবি আঁকা শেষ করে জাইমা সেটি হিয়াকে দিতে চেয়েছিল। পরে অ্যাম্বুলেন্সে কফিনের একটি রশির সঙ্গে ছবিসহ চিরকুটটি বেঁধে দেওয়া হয়।
বন্ধু, আবার দেখা হবে
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও জাইমার কান্না থামছিল না। মা–বাবা নানাভাবে তাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। কখনো ল্যাপটপ দিয়ে, কখনো অন্য কোনো কাজে মনোযোগ সরিয়ে। তবু বারবার ফিরে আসছে বন্ধুর কথা।
জসীম উদ্দীন জানিয়েছেন, হাসপাতালে বসেই জাইমা বারবার বলছিল, ‘আই মিস ইউ হিয়া। আই লাভ ইউ সো মাচ।’
হিয়ার বাবা খোকন মিয়া ও মা শাহীনা আক্তারও বলেন, দুজনের বন্ধুত্ব ছিল গভীর। আগেও তারা একজন আরেকজনের জন্য ছবি এঁকে দিয়েছে। দেখা হলেই গাল টিপে দিয়েছে। স্কুল আলাদা হয়েছে, বাসা বদলেছে, কিন্তু তাদের বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি হয়নি।
শুধু এবার জাইমার আঁকা ছবিটি আর হিয়ার হাতে পৌঁছাল না। তবু আট বছরের ছোট্ট জাইমা তার বন্ধুকে লিখে রেখেছে এক অসমাপ্ত বিশ্বাসের কথা, ‘আই উইল সি ইউ এগেইন।’