কোনো রাজনৈতিক সরকার চায়নি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক

‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কার: মাসদার হোসেন মামলা, রায়ের রজতজয়ন্তী ও বাস্তবায়নের ১৭ বছর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। ঢাকা, ১ নভেম্বরছবি: আশরাফুল আলম

এখন পর্যন্ত দেশের কোনো রাজনৈতিক সরকার চায়নি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক। সব সরকার চায় বিচারক তার পছন্দের হতে হবে এবং সে যেভাবে চাইবে, বিচারক সেভাবেই কাজ করবেন। রাজনীতিবিদেরা হস্তক্ষেপ না করলে একটা স্বাধীন ও কার্যকর বিচার বিভাগ পাওয়া যাবে।

‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কার: মাসদার হোসেন মামলা, রায়ের রজতজয়ন্তী ও বাস্তবায়নের ১৭ বছর’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদেরা এ কথা বলেন। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটে আরএইচ হোম সেন্টারে এই সভার আয়োজন করে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)। ইউপিএল থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত মিল্লাত হোসেন অনূদিত ও সম্পাদিত বই ‘বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ প্রসঙ্গ মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও মূল ইংরেজি ভাষ্য’ নিয়ে এই আলোচনা সভা হয়।

সভায় দ্য নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, বিচারিক কার্যক্রম ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় হওয়া উচিত। ইংরেজিতে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করায় তা জনবিচ্ছিন্ন। বিচারপ্রার্থীরা বুঝতেই পারেন না সেখানে কী হচ্ছে।

বিচার বিভাগের পুরো প্রক্রিয়াকে নজরদারিতে রাখার প্রয়োজন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, মিথ্যা মামলা গ্রহণের জন্য পুলিশকে দোষারোপ করলেও যে আদালতগুলো বছরের পর বছর মিথ্যা মামলাগুলো গ্রহণ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক। তিনি বলেন, সংবিধানের দোষের চেয়েও বড় দোষ হচ্ছে রাজনীতিবিদেরা বিচার বিভাগকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে চান। সেটা সব সরকারই করেছে। রাজনীতিবিদেরা হস্তক্ষেপ না করলে একটা স্বাধীন ও কার্যকর বিচার বিভাগ পাওয়া যাবে।

বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক, রাজনৈতিক সরকার কখনো তা চায় না বলে মনে করেন বিএনপির সহ–আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকার কখনো চায় না বিচার বিভাগ একটা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে—রাজা তুমি অপরাধ করেছ, এটা বলার সাহস রাখুক।’

রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তারা কোনো অবস্থাতেই চায় না তাদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ুক। দ্বিতীয়বার তারা ক্ষমতায় আসবে কি আসবে না, সেটা মানুষ নির্ধারণ করুক—এই অনিশ্চয়তা কোনো রাজনৈতিক দল নিতে চায় না।

সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ আইন এত বছরেও কোনো সরকার করেনি উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার চায় বিচারক তার পছন্দের হতে হবে এবং সে যেভাবে চাইবে, বিচারক সেভাবেই কাজ করবে। সে কারণে বিচারক নিয়োগের আইন তারা করে না।

উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকা যাবে না বলে মনে করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগের একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়ের রূপরেখা গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মুহা. হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে উভয় বিভাগের বিচারপতিরা অভিমত প্রকাশ করেছেন কীভাবে, এটা বাস্তবায়িত হতে পারে। পৃথক সচিবালয় বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধানের সংশোধন প্রয়োজন নেই। একটা অধ্যাদেশ দিয়ে তা করা যাবে।

বিচার প্রার্থনার ৯৮ শতাংশই হয় নিম্ন আদালতে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের অনেক কিছুই এখনো আইন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করে বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারক থাকলে তাঁদের বিচারকাজে রাখা উচিত নয়। কিন্তু সেটাও একটা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার আলোচিত মামলার বাদী সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মামলা করার সময় আমি আশাবাদী ছিলাম, কিন্তু এখন এসে কিছুটা শঙ্কিত। প্রত্যেকবার রাজনৈতিক সরকার এ–ছুতায় বা ও–ছুতায় বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ গলা চেপে মেরেছে।’ এই অন্তর্বর্তী সরকারের এত প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক গভীরতা নেই উল্লেখ করে মাসদার হোসেন বলেন, এখন যাঁদের পদায়ন হচ্ছে তাঁরা কারা, তাঁদের আমলনামা কী, তা কি দেখা হচ্ছে?

এ সময় আরও বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন, লেখক ও গবেষক মিল্লাত হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইউপিএলের নির্বাহী (জনসংযোগ বিভাগ) ইলিয়াস জামান।